লুটপাটে বিরাণভূমি হওয়ার পর সাদাপাথরের পাথর ফেরাতে ঘুম ভেঙেছে প্রশাসনের। হয়েছে তদন্ত কমিটি, পরিদর্শন করেছে দুদক টিম। পাথর পুনঃস্থাপন ও রক্ষায় নেয়া হয়েছে একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত। এক রাতে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১২ হাজার ফুট পাথর। বুধবার দিবাগত রাতেই ডিবি পুলিশের অভিযান গ্রেফতার করা হয়েছে এক ইউপি চেয়ারম্যানকে।

তবে শেষ মুহূর্তে প্রশাসনের এমন কর্মকাণ্ডে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। অনেকের মন্তব্য, রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার এসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনের নজিরবিহীন লুটপাটে পাথর শূন্য হয়ে পড়েছে সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট সাদাপাথর। পানির পাথর লুটপাট শেষে মাটি কুঁড়েও লুট হয়েছে পাথর। এমন ভিডিও ও ছবি মিডিয়ায় ভাইরালের পর দেশ-বিদেশে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। এর পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি পর্যালোচনা ও সমন্বয় সভার আহ্বান করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক।

বুধবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিলেট সার্কিট হাউজে সিলেট বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রশাসনের সর্বস্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় পাথর লুটপাট ঠেকানো ও লুটের পাথর সাদাপাথরে পুনঃস্থাপনে পাঁচ দফা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সিদ্ধান্তগুলো হলো জাফলং ইসিএ এলাকা ও সাদাপাথর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা যৌথবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জে পুলিশের চেকপোস্টে যৌথ বাহিনীসহ সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। অবৈধ ক্রাশিং মেশিনের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নসহ বন্ধ করার জন্য অভিযান চলমান থাকবে। পাথর চুরির সাথে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। চুরি হওয়া পাথর উদ্ধার করে পূর্বের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে হবে।

জানা গেছে, গত দু’সপ্তাহে সিলেটের সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রে নজিরবিহীন পাথর লুটপাট হয়। সীমান্তের জিরো লাইন-সংলগ্ন ১০ নম্বর এলাকার ‘সাদাপাথর’-এর সব পাথর নিয়ে যায় লুটেরার দল। অথচ পাথর উত্তোলনে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে লাগামহীন লুটপাটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সাদাপাথর এখন বিরাণভূমি। একইভাবে সিলেটের জাফলং ইসিএভুক্ত এলাকা থেকেও বালু-পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকে।

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে স্থানীয় সব রাজনৈতিক দলগুলো একাট্টা হয়ে সরকারের কাছে পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার জন্য বারবার দাবি জানায়। তবে তাদের বক্তব্য ছিল আইনি প্রক্রিয়ায় পাথর উত্তোলন-সংক্রান্ত, পাথর লুট করার উদ্দেশে নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের পাথর কোয়ারি খুলে দেয়ার নিয়মতান্ত্রিক দাবিকে পুঁজি করে লুটপাটে মত্ত হয়ে উঠে কতিপয় পাথরখেকো চক্র। দিনে-রাতে পাথর লুটের মহোৎসবে মেতে উঠে তারা। ব্যাপক সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে টনক নড়ে সিলেটের প্রশাসনের। মঙ্গলবার একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। বুধবার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন এতদিন নীরব থাকা বিভিন্ন সামাজিক সুশীলসমাজসহ পরিবেশবাদী সংগঠন।

দুদক টিমের সাদাপাথর পরিদর্শন
দুদকের সিলেট কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাফী মোহাম্মদ নাজমূস সাদাতের নেতৃত্বে দুদকের একটি টিম সাদাপাথর এলাকার লুটপাটের চিত্র দেখতে বুধবার (১৩ আগস্ট) সরেজমিন ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর এলাকায় যান। পরিদর্শন শেষে দুদক কর্মকর্তারা জানান, সাদাপাথরে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। এতে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও স্থানীয়রা এবং প্রশাসনের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন। তবে তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেয়া হবে।

দুদক কর্মকর্তারা বলেন, সাদাপাথর লুটপাটের বিষয়টি সারাদেশে ভাইরাল হয়েছে। বাস্তব অর্থে আমরা এখানে এসে তাই দেখলাম, সব পাথর লুটপাট করে নিয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানতে পারলাম, প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক এখানে পাথর লুটপাট করেছে।

দুদক কর্মকর্তারা স্থানীয় মানুষদের সাথে কথা বলেছেন, শুনেছেন, অনেকের নাম পেয়েছেন, যারা এই পাথর লুটের সাথে জড়িত। এই ব্যক্তিরা ছাড়াও প্রশাসনের দায়বদ্ধতাও দেখা হবে বলে জানান তারা।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের পর পরবর্তী নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করা হবে। তাছাড়া স্পেশালিস্ট কোনো টিম এলে দেখা যেত কত টাকার পাথর লুট হয়েছে। তবে কোটি কোটি টাকার তো হবেই বলে জানান তারা।

স্থানীয়রা জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর থেকে শুরু হয় আদালতের নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ থাকা পাথররাজ্যে লুটপাট। শাহ ভোলাগঞ্জের আরেফিন টিলা, রোপওয়ে বাংকার থেকে প্রকাশ্যে পাথর উত্তোলন করে এখন ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।

এক রাতেই উদ্ধার ১২ হাজার ঘনফুট পাথর
চুরি ও লুট হওয়া সাদাপাথর উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে এক রাতেই প্রায় ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত পাথরগুলো রাতেই পুনরায় নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এর আগে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে পাথরবোঝাই ট্রাক রাস্তায় আটকে দেয়া হয়।

বুধবার (১৩ আগস্ট) রাত ১২টার পর থেকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথরের পাশের কালাইরাগ এলাকা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। এছাড়া সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের সিলেট ক্লাবের সম্মুখে যৌথবাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান পরিচালনা করে।

বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) দৈনিক নয়া দিগন্তকে এর সত্যতা নিশ্চিত করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাদাপাথর এলাকা থেকে চুরি হওয়া পাথর উদ্ধারে জেলা প্রশাসনের অভিযান জোরদার হয়েছে। এ সময় সাদা পাথরের পাশের কালাইরাগ এলাকা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়। এক রাতের অভিযানে সাদাপাথরে ফিরল ১২ হাজার ঘনফুট পাথর। সাদা পাথর বাঁচাতে পাঁচ দফা সিদ্ধান্ত প্রশাসনের এসব পাথর আবার সাদা পাথরে পুনরায় রাখা হয়েছে। এছাড়া কলাবাড়ি এলাকায় পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু যন্ত্রের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আজিজুন্নাহার বলেন, নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে অভিযান চালায় জেলা প্রশাসন। অভিযানে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সহায়তা করে। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় যতটুকু পর্যন্ত সেনাবাহিনী যেতে পারে, তারা ততটুকু পর্যন্ত গেছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া কর্মকর্তা উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, সাদা পাথর থেকে চুরি হওয়া পাথর উদ্ধারে আমরা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে অভিযান ও চেক পোস্ট পরিচালনা করছি। এসএমপির আওতাধিন এলাকায় অবস্থানরত অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সিলেট ক্লাবের সম্মুখে যৌথবাহিনীর অভিযান চলমান আছে। অপরাধ বন্ধ করতে আমরা জিরো টলারেন্স আছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আক্তার মিতা দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, চুরি ও লুট হওয়া সাদা পাথর উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রায় ১২ হাজার ঘনফুট পাথর জব্দ করা হয়েছে। চুরি হওয়া পাথর ফেরাতে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। চুরির সাথে জড়িতদের শনাক্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের বল্লাঘাট, ঝুমপাহাড় ও জিরো পয়েন্ট এলাকায়ও বুধবার বেলা ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলন ঠেকাতে অভিযান চালানো হয়। এতে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার পলি রানী দেব।

অভিযান সূত্রে জানায়, অভিযানে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত ১০০টি বারকি নৌকা ভেঙে ফেলা হয়। পাশাপাশি অবৈধভাবে উত্তোলন করা ১৩০ ফুট বালু জব্দ করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার পলি রানী দেব। তিনি বলেন, জাফলংয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও পরিবহনের যুক্ত প্রায় ১০০টি নৌকা আটক করে তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন রোধে সিলেট জেলা প্রশাসনের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইউপি চেয়ারম্যান আটক
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ডিবি পুলিশের অভিযানে ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনকে আটক করা হয়েছে। তিনি পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান। বৃহস্পতিবার ভোর রাতে তার বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়।

জানা গেছে, আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে বালু পাথর চুরির একটি মামলার ওয়ারেন্ট থাকায় তাকে আটক করেছে ডিবি। গত বছরের ৫ আগষ্টের পর সাদাপাথর লুটপাটের অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। ওই সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তার নৌকা আটক করে তাকে সতর্ক করে ছিলেন। এরপর থেকে তখন আর তিনি কোনো নৌকা সাদাপাথরে পাঠাননি বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি, তদন্ত) সুজন চন্দ্র জানান, আলমগীর হোসেন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আগের একটি মামলায় ওয়ারেন্ট থাকায় তাকে আটক করেছে ডিবি। সকালে ডিবি আমাদের কাছে তাকে হস্তান্তর করেছে। আমরা তাকে আদালতে প্রেরণ করব।