১৫ মাসের চোট কাটিয়ে ফিরেছিলেন দুর্দান্তভাবে। ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে ঝড় তুলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু সেই গতিই আবার ফিরিয়ে আনল পুরোনো ব্যথা। পরীক্ষা করে জানা গেল—আড়াই বছর পেরিয়েও পিঠের হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।
এমতাবস্থায় তার সামনে ছিল তিনটি পথ। দীর্ঘ বিশ্রাম, অস্ত্রোপচার কিংবা চোট নিয়েই ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া। ২১ বছরের রোহানাত দৌলা বর্ষণ বেছে নিলেন শেষেরটিই। চোট মানিয়ে নিয়েই মাঠে ফিরছেন তিনি।
ক্রিকেটে চোট নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিশেষ করে দ্রুতগতির পেসারদের জন্য শরীরের ওপর প্রতিটি ডেলিভারিই যেন একেকটি পরীক্ষা। কিন্তু কোনো চোট যখন বছরের পর বছর সাথে থাকে, তখন সেটি শুধু শরীরের নয়, মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা নেয়।
বর্ষণ এখন সেই পরীক্ষার মধ্যেই আছেন। অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টি খেলতে গিয়ে পুরোনো পিঠের ব্যথা আবার ফিরে আসে। দেশে ফেরার আগে সেখানকার চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তিনি। স্ক্যান করানো হয়। বড় কোনো নতুন সমস্যা ধরা পড়েনি।
তবে পুরোনো স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের জায়গায় হাড় যে এখনো পুরোপুরি জোড়া লাগেনি, সেটি স্পষ্ট হয়েছে। এরপর অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক বর্ষণের সামনে রাখেন তিনটি পথ।
প্রথমটি—এক থেকে দেড় বছর পুরোপুরি ক্রিকেটের বাইরে থাকা। কিন্তু এত দীর্ঘ বিশ্রাম নিলেই যে হাড় নিশ্চিতভাবে জোড়া লাগবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই। কারণ এরই মধ্যে দুই থেকে আড়াই বছর কেটে গেলেও হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগেনি।
দ্বিতীয় পথ—অস্ত্রোপচার। কিন্তু অস্ত্রোপচার করলেও অন্তত এক বছর মাঠের বাইরে থাকতে হবে। আর তৃতীয় পথ—চোটকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়া। বর্ষণ বেছে নিয়েছেন তৃতীয় পথটাই।
বর্ষণ বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার তিনটা অপশন দিয়েছে। এক থেকে দেড় বছর পুরোপুরি বিশ্রাম, এটা একটা অপশন। কিন্তু দুই থেকে আড়াই বছর হয়ে গেলেও হাড় পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। ফলে এই গ্যাপটা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
‘এক থেকে দেড় বছর বাইরে থাকলেও উন্নতির নিশ্চয়তা নেই। এত লম্বা সময় নষ্ট করতে চাই না। দ্বিতীয় অপশন সার্জারি। যেটা করলে মিনিমাম এক বছর বাইরে থাকতে হবে। আমি এটাতেও রাজি নই।’
তবে আগের মতো নয়। শরীরের ওপর চাপ বুঝে। ব্যথা বাড়লে বিশ্রাম, ব্যথা কমলে আবার বোলিং। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এভাবেই আপাতত ক্যারিয়ার এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা তার।
বর্ষণ বলেন, ‘তৃতীয় অপশন হচ্ছে এভাবেই খেলে যাওয়া। যখন চাপ বেশি পড়বে ব্যথাটা ফিরে আসবে। কয়েকদিন বিশ্রাম নিলে আবার ঠিক হয়ে যাবে। এই যেমন গত এক-দেড় সপ্তাহের বিশ্রামে আবার বোলিংয়ের জন্য ফিট হয়ে গেছি।’
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসকের কাছ থেকে বর্ষণ আরো একটি আশার কথা শুনেছেন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই চোট সামলানোর সক্ষমতা বাড়তে পারে। এমনকি ২৩ বছর বয়স পার করার পর হাড় ধীরে ধীরে জোড়া লাগার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে চিকিৎসক তাকে জানিয়েছেন।
বর্ষণ বলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন বয়সের সাথে এটা সামলানোর দক্ষতাটা বাড়বে। ২৩ বছর পার হলে জোড়াটাও আস্তে আস্তে জোড়া লেগে যেতে পারে। আর এটা সাথে করে খেলার জন্য ক্যাপাবিলিটিও বাড়বে।’
তবে আপাতত ক্রিকেট থেকে পুরোপুরি দূরে থাকছেন এই তরুণ পেসার। আগামী দুই মাস চলবে তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। থাকবে জিম সেশন, রানিং ও নির্দিষ্ট ফিটনেস কার্যক্রম। লক্ষ্য একটাই—শরীরকে প্রস্তুত করে ধীরে ধীরে আবার বোলিংয়ের চাপ নেয়া।
বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগও বর্ষণের ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজ করে খেলা’র পরিকল্পনাতেই এগোচ্ছে। বিসিবির মেডিক্যাল বিভাগের একটি সূত্র বলেছে, ‘ওকে ম্যানেজ করেই খেলতে হবে। হাড় জোড়া না লাগলে ব্যথা মাঝেমধ্যে ফিরবে, বাড়বে আবার কমবে।’
‘বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে খেলতে হবে। মানে ম্যানেজ করে খেলতে হবে। তবে জোড়া লেগে গেলে সমস্যা হবে না। কিন্তু অনেকদিন হয়ে গেলেও জোড়া লাগেনি। অস্ট্রেলিয়ায় করা স্ক্যানেও জোড়া না লাগার বিষয়টি এসেছে, তবে রিপোর্ট ভালো ছিল।’
বর্ষণের গল্পটা অবশ্য শুধু চোটের গল্প নয়। বরং চোটকে হারিয়ে উঠে আসার গল্পও। প্রায় ১৫ মাস মাঠের বাইরে থাকার পর চলতি বছর ক্রিকেটে ফিরেই ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে নজর কেড়েছিলেন তিনি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচপি দলের হয়ে ওয়ানডে সিরিজে ১২ উইকেট নিয়ে নিজের প্রত্যাবর্তনকে আরো উজ্জ্বল করেন।
সেই পারফরম্যান্সই তাকে নিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে। সেখানে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে ১৪৫ কিমি/ঘণ্টার বেশি গতিতে বল করে চার উইকেটও নিয়েছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত গতির সাথে শরীরে পড়া বাড়তি চাপ আবার জাগিয়ে তোলে পুরোনো ব্যথাকে।