গাজায় পুলিশ সদর দফতরে ইসরাইলি বিমান হামলা : নিহত ১০

Printed Edition
Inter-1
গাজা সিটির মধ্যাঞ্চলে থানায় ইসরাইলি হামলার পর হতাহতদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা : ইন্টারনেট

রয়টার্স ও আনাদোলু

গাজার একটি শহরের পুলিশ সদর দফতরে ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ অন্তত ৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। একই দিন মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে পৃথক বিমান হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়। গাজা যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যর্থ হওয়ার পর তার বিশেষ দূত ও জামাতা জ্যারেড কুশনার পশ্চিম এশিয়া সফর করেন। তার সফর শেষ হওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় এ হামলা চালানো হলো।

ফিলিস্তিনি চিকিৎসা ও পুলিশের সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, বুধবারের এই হামলায় আরো অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্ত স্থানটি মিউনিসিপ্যাল বা পৌর পুলিশের প্রধান কার্যালয় ছিল। এর আগে একই দিন মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে পৃথক বিমান হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এ নিয়ে বুধবারে ইসরাইলি হামলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১০ জনে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নুসেইরাতের হামলায় এক হামাস যোদ্ধাকে ল্যস্থল করার কথা জানালেও পুলিশ সদর দফতরে হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত জুলাইয়ের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেন, হামাস একটি ‘রোডম্যাপে’ সম্মতি দিয়েছে, যার অধীনে ইসরাইল সেনা প্রত্যাহার ও সামরিক অভিযান বন্ধ করলে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি ধাপে ধাপে তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে। তবে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনকে সামনে রেখে মতামত জরিপে পিছিয়ে থাকা ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানান, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে কোনো সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। অন্য দিকে হামাস গাজা থেকে পূর্ণাঙ্গ সেনা প্রত্যাহার ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে অনড় রয়েছে।

ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তার পর্যায়ক্রম বা ধারাবাহিকতা নিয়েও দু’পরে মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, হামাস ও গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর আসন্ন হামলা নস্যাৎ করতেই তারা এসব বিমান হামলা চালাচ্ছে। এর আগে মঙ্গলবার গাজার এক সৈকত ক্যাফেতে হামলা চালিয়ে এক শিশুসহ অন্তত সাত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরাইলি বাহিনী। সে সময়ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, সেনাবাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হামাস কমান্ডারদের ল্য করেই ওই হামলা চালানো হয়।

হুমকির মুখে শান্তিপ্রক্রিয়া : বুধবার হামাসের এক কর্মকর্তা জানান, তারা মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার ও তুরস্ককে জানিয়ে দিয়েছে, ইসরাইল যদি এভাবে নিশানা করে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানো বন্ধ না করে, তবে তা যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে তাদের অবস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হামাস কর্মকর্তারা জানান, রোববার মিসরে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ এবং জ্যারেড কুশনারের সাথে হামাস নেতাদের বৈঠকে ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা বন্ধের আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। তবে ওই আশ্বাস সত্ত্বেও ইসরাইলের এ নতুন হামলা কুশনারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বড় ধরনের ধাক্কা দিলো।

তীব্র গরমে তাঁবুতে দুর্বিষহ বাস্তুচ্যুতদের জীবন

গাজার দণিাঞ্চলে তীব্র গরমে জীর্ণ তাঁবুতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ বা বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা না থাকায় সরাসরি রোদ ঠেকাতে তাঁবুর ওপর অতিরিক্ত কাপড় ও প্লাস্টিকের আবরণ দিচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ তাঁবুর অংশ খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করছেন, আবার শিশুদের শরীরে পানি ঢেলে গরম থেকে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা করছেন।

পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত : অধিকৃত পশ্চিমতীরের কুসরা শহরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে গুলির ছররা লেগে ৭০ বছর বয়সী এক নারী ও ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী আহত হয়েছেন। বুধবার একটি বাড়িতে অভিযানের সময় এ ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

এ দিকে কুসরায় তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের অবরোধ ১১তম দিনে গড়িয়েছে। স্থানীয় মেয়র আবদুল আজিম আল-ওয়াদি জানান, ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতিতে বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িগুলো ঘিরে রেখেছে। একটি বাড়ি দখল করে সেটিকে সামরিক পোস্টেও পরিণত করা হয়েছে। পশ্চিমতীরের বিভিন্ন এলাকায়ও ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। রামাল্লার আল-মুঘাইয়ির থেকে এক ফিলিস্তিনি তরুণকে আটক করা হয়েছে। দেইর জারিরে ফিলিস্তিনিদের জমিতে বসতিস্থাপনকারীরা গবাদিপশু ছেড়ে দেয়। নাবলুসের দোমা গ্রামে ২০টির বেশি পুরনো জলপাইগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বেইতা ও বেইত ফুরিকেও অভিযান চালানো হয়।

এ দিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় পশ্চিমতীরে ১০৭টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ২০২৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ৬ দশমিক ৬টি হামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা জাতিসঙ্ঘের রেকর্ডে সর্বোচ্চ। সংস্থাটি বলেছে, হামলা, অগ্নিসংযোগ, সম্পত্তি ধ্বংস ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের পেছনে বসতিস্থাপনকারীরা ইসরাইলি রাষ্ট্রের আর্থিক, সামরিক ও আইনি সহায়তা পাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘও পশ্চিমতীরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছে।

গাজায় অস্ট্রেলীয় ত্রাণকর্মী লালজাওমি ‘জোমি’ ফ্র্যাঙ্ককম ও তার সহকর্মীদের হত্যার ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত না চালানোর ইসরাইলি সিদ্ধান্তে ‘ক্ষুব্ধ’ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির শীর্ষ কূটনীতিক বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক বিবৃতিতে বলেন, এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত হিলেল নিউম্যানকে তলব করা হবে। একই সাথে ইসরাইলে নিযুক্ত অস্ট্রেলীয় রাষ্ট্রদূতকে দেশটির সরকারের কাছে ‘সরাসরি আমাদের অবস্থান জানাতে’ বলা হয়েছে। সিডনি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে। ওং বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া সরকার গত রাতে ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানতে পারে। ঘোষণার মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে আমাদের এ বিষয়ে জানানো হয়। বিশ্ব মানবিকতা দিবসে এমন সিদ্ধান্ত জোমির স্বজন, মানবিক সহায়তাকর্মী এবং সব অস্ট্রেলীয় নাগরিকের জন্য বিশেষভাবে অপমানজনক।’

২০২৪ সালের এপ্রিলে ইসরাইলি বিমান হামলায় ভুল করে তাদের ত্রাণবহরে আঘাত হানলে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাত কর্মীর একজন হিসেবে ফ্র্যাঙ্ককম নিহত হন। তাদের মৃত্যু বিশ্বজুড়ে ােভের সৃষ্টি করে।

রাফাহ থেকে বাস্তুচ্যুত জামালাত সিয়াম আল-মাওয়াসি এলাকায় তাঁবুতে থাকেন। তিনি বলেন, গরমে তাঁবুর ভেতরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শিশুদের গরম থেকে রা করতে পানি ঢালতে হচ্ছে, এতে তারা কখনো কখনো কান্ত হয়ে পড়ছে।

খান ইউনুসের পাঁচ সন্তানের মা খোলুদ আবু মোহসেন জানান, পানি সংগ্রহে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। পানির সঙ্কটের কারণে সন্তানদের ঠাণ্ডা করতে চাইলেও পানি ব্যবহারে হিসাব করতে হয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর তৈরি আশ্রয়ে বাতাস চলাচলের জন্য কিছু অংশ খুলে দিলেও তাপ কমছে না। বিদ্যুতের অভাবে কার্ডবোর্ড ও প্লাস্টিকের টুকরা পাখার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছেন তারা। যুদ্ধের কারণে গাজার ২৪ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছেন। ইসরাইলি হামলায় উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো তিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। খাদ্য ও পানির সঙ্কটের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে তীব্র গরমও নতুন দুর্ভোগে ফেলেছে।