তুরস্ক বুধবার সকালে এক নাটকীয় রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে যায়, যখন ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু এবং আরো ১০০ জনকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে (পিকেকে) সহায়তা করার অভিযোগে আরেকটি তদন্ত শুরু হয়েছে। আঙ্কারা সরকার পার্টিটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।

গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ শুরু হয়। বিশেষ করে ফাতিহ জেলায় ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এবং পৌরসভার সামনে বিক্ষোভ দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাকসিম মেট্রো স্টেশন চার দিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শহরজুড়ে সব ধরনের সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল প্রতিক্রিয়া

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমামোগলুর গ্রেফতার তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তুর্কি বিষয়ের গবেষক মাহমুদ আলুশ বলেন, ‘এই মামলার রায় যদি ইমামোগলুর বিরুদ্ধে যায়– যা অত্যন্ত সম্ভবনাময়ী – তাহলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং প্রেসিডেন্ট পদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই ঘটনাটি শুধু বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)-এর অভ্যন্তরীণ গঠনকেই প্রভাবিত করবে না। বরং তুরস্কের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করবে। একদিকে, এটি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণ বদলে দেবে। অন্যদিকে সিএইচপির নেতৃত্ব পুনর্গঠনের পথ খুলে দেবে।‘

বিরোধী দলের ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্ব সঙ্কট

ইমামোগলুর জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের ভূমিকা বিবেচনায় বিরোধী দল সিএইচপি তাকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখছিল। কিন্তু তার গ্রেফতার দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান দলীয় নেতা ওজগুর ওজাল, আঙ্কারার মেয়র মনসুর ইয়াভাস, এমনকি সাবেক নেতা কামাল কিলিকদারোগলু এই শূন্যতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারেন।

তুর্কি রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাহা ওদেহ ওগলু মনে করেন, ‘বিরোধী দলগুলোর প্রেসিডেন্ট পদ জয়ের স্বপ্ন এখন মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তারা ইমামোগলুকে সামনে রেখে এরদোগানের শাসনকে দুর্বল করতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।‘

তিনি আরো বলেন, ‘এই পরিস্থিতি তুর্কি সমাজে বড় বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।‘

বিচার বিভাগের রাজনৈতিক শোষণের অভিযোগ

ইমামোগলুর গ্রেফতারের ঘটনাকে বিরোধীরা বিচার বিভাগের রাজনৈতিক শোষণ হিসেবে দেখছে। সিএইচপি নেতা ওজগুর ওজাল এটিকে ‘রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা‘ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিপজ্জনক।‘

অন্যদিকে, তুরস্কের বিচারমন্ত্রী ইলমাজ টুনচ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এই তদন্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং প্রেসিডেন্টর সাথে এর কোনো সংযোগ নেই। আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করছে, এবং আইনের সামনে সবাই সমান।‘

অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব

ইমামোগলুর গ্রেফতারের খবর আসার পরপরই তুর্কি লিরার মূল্য ১২.৭ শতাংশ কমে প্রতি ডলারে ৪২ লিরায় পৌঁছে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতন।

তুরস্কের শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাজার ৬.৮৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়, যেখানে ব্যাংকিং সূচক ৯.৬৭ শতাংশ কমে যায়।

অর্থমন্ত্রী মেহমেত সিমসেক আশ্বস্ত করেছেন যে সরকার বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে আরো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইমামোগলুর গ্রেফতার তুরস্কের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এটি বিরোধী দল সিএইচপির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তুলতে পারে। একইসাথে এই ঘটনা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি করেছে, যা তুরস্কের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল কীভাবে এই সঙ্কট মোকাবিলা করবে এবং তুরস্কের রাজনৈতিক অঙ্গন কিভাবে পুনর্গঠিত হবে? ইমামোগলুর শূন্যতা পূরণে সিএইচপি কি নতুন নেতৃত্ব উপস্থাপন করতে পারবে, নাকি এই ঘটনা বিরোধীদের শক্তি দুর্বল করে দেবে? ভবিষ্যতের তুর্কি রাজনীতির গতিপথ এই ঘটনার প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে।

সূত্র : আল জাজিরা মুবাশ্বির