জনপ্রিয় গায়ক, গীতিকার এবং সুরকার। সঙ্গীতাঙ্গনে সকলের মন জয় করতে যা যা লাগে, সব গুণই তার আছে। আর এসব গুণ যে তিনি খুব ভালোভাবে প্রয়োগ করতে জানেন, সেটা ভক্তরা বুঝতে শুরু করেন ২০১৮ সাল থেকে, সঙ্গীতের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান ‘সারেগামাপা’-তে। ভারতের এই অনুষ্ঠানটিতে বাজিমাত করেন বাংলাদেশী এই গায়ক। তার নাম মাইনুল আহসান নোবেল।
সম্ভাবনাময় এই শিল্পী ওই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানটিতে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। মূলত এই প্রতিযোগিতা থেকেই বাঙালিরা তার গুণমুগ্ধ ভক্ত হওয়া শুরু করেন। বিশেষত, তার দরাজ কণ্ঠের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ লাইনগুলো এখনো শ্রোতাদের বিমুগ্ধ করে চলছে।
কিন্তু এই নোবেলকে নিয়ে মানুষ যে সুদূরের স্বপ্ন বুনছিল- তা তিনি এরই মধ্যে ধ্বংস করে ফেলেছেন নিজের চারিত্রিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে। এর সবশেষ সংযোজন- তার বিরুদ্ধে ইডেন কলেজের এক ছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগ। বর্তমানে ওই তরুণীর মামলায় নোবেল কারাগারে রয়েছেন। তরুণীর অভিযোগ- নোবেল নিজ বাসায় তাকে ৭ মাস আটকে রেখে বিভিন্ন সময় ধর্ষণ করেছেন।
এর আগে আরো বেশ কয়েকবার বিভিন্ন অভিযোগের তীর নোবেলের দিকে গিয়েছে। যার শুরু হয়েছিল ভারতের ‘সারেগামাপা’-তেই। গোপালগঞ্জের ছেলে নোবেল ২০১৯ সালে ‘সারেগামাপা’ অনুষ্ঠানে চ্যাম্পিয়ন হবেন বলে আশা করছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বে তাকে তৃতীয় ঘোষণা করে জি বাংলা কর্তৃপক্ষ। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘তার গান বিচার করার ক্ষমতা বিচারকদের নেই।’ এই মন্তব্যের জেরে তাকে সাসপেন্ড করেছিল কর্তৃপক্ষ।
মূলত এই ঘটনায় মুখ খুলেই তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের শুরু। যদিও ভক্তরা তার এই প্রতিবাদকে তখন সাধুবাদ জানিয়েছিলেন। এ ছাড়াও এরপর একেককরে আরো অভিযোগ বাড়তে থাকে তার বিরুদ্ধে। নোবেলের বিরুদ্ধে প্রথম ধর্ষণের মামলা হয় ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। চট্টগ্রামের এক তরুণী তার বিরুদ্ধে মামলাটি করেন।
ধর্ষণের ওই মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সালসাবিল মাহমুদকে ভালোবেসে বিয়ে করেন নোবেল। পরে দুজনের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ ও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার ঘটনা ঘটে। দুজনই একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে গণমাধ্যমের শিরোনাম হন। একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
পরে তার সাবেক এই স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ২০ মে নোবেলকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কার্যালয়ে নেয়া হয়। তৎকালীন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেছিলেন, নোবেলের বিরুদ্ধে তার স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে মামলাও আছে। তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
জাতীয় সংগীত ও এর রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে সমালোচিত হন তিনি। জেমসকে নিয়েও বাজে মন্তব্য করে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন নোবেল।
সাংবাদিককে হুমকি দেয়ার অভিয়োগও আছে তার বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১৭ মে সময় টিভির এক বিনোদন সাংবাদিক তাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করলে নোবেল ক্ষুব্ধ হন। পরে ওই সাংবাদিককে ফোন করে বাসা থেকে তুলে নেয়ার হুমকি দিয়ে নোবেল বলেন, ‘নোবেলকে তুই চিনিস? নোবেল কী শিল্পী? নোবেল কিন্তু ক্যাডার।’ এ সময় ফোনে নিজেকে সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার আপন শ্যালক বলে উল্লেখ করেন। শুধু তা-ই নয়, সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে সেই রিপোর্টারকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসার হুমকিও দেন।
ফেসবুকে মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে সংগীতশিল্পী মাঈনুল আহসান নোবেলের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১ জুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছিলেন সংগীত পরিচালক ইথুন বাবু। এতে তিনি অভিযোগ করেন, নোবেল তার ফেসবুক পেজ ‘নোবেল ম্যান’ থেকে দেয়া এক পোস্টে ইথুন বাবুকে চোর বলেছেন। ওই পোস্টে নোবেল লিখেছেন, ‘ইথুন বাবু একটা চোর। অন্যের গান নিজের নামে চালায় দিয়েছে।’
নোবেল ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল মদ্যপ অবস্থায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে কনসার্টে ওঠেন। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন এবং আচরণ অনিয়ন্ত্রিত থাকায় দর্শকেরা তার ওপর পানির বোতল ও জুতা ছুড়ে মারেন।
২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ফেসবুকে এক নারীর সাথে তিনি তিনটি ঘনিষ্ঠ ছবি পোস্ট করেন নোবেল। সেখানে লেখেন, মেয়েটি তার স্ত্রী। খুলনার মেয়েটি ছিলেন ফারজানা আরশি। পেশায় ফুড ব্লগার। পরে জানা যায়, নোবেলকে বিয়ের আগে আরশির নাদিম আহমেদ নামের এক ফুড ব্লগারের সাথে বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়ে দুই বছর পর ভেঙে যায়। পরে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে নোবেলের সাথে সম্পর্ক তৈরি হয় আরশির। এই বিয়েও বেশি দিন টেকেনি। বিয়ের সপ্তাহখানেকের মাথায় নোবেল ভর্তি হন মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে (পাগলাগারদে)।
নোবেলের বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ তুললেন ইডেনের ওই শিক্ষার্থী। পুলিশ জানায়, গত নভেম্বরে এক ছাত্রীকে গুলশানে দেখা করার কথা বলে নোবেল তাকে ডেকে আনেন। তাকে বিয়ের আশ্বাস দেন। পরে সাত মাস ডেমরার একটি বাসায় তাকে আটকে রাখা হয়। এই সময়ে তিনি ওই ছাত্রীকে নির্যাতন ও নিয়মিত ধর্ষণ করেন। এসব ঘটনা নোবেল নিজের মুঠোফোনে ধারণ করেছেন। সেই ভিডিও দিয়ে ইডেনের ওই ছাত্রীকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করেছিলেন বলে দাবি পুলিশের। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ছাত্রীটিকে ব্ল্যাকমেল করার অভিযোগে আলোচিত এই শিল্পীর বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনেও মামলা হয়।
তরুণীর অভিযোগো বলা হয়, নোবেল ৭ মাস ধরে তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছেন। এছাড়াও অপহরণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোবেল ও মেয়েটির বেশকিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। সেসব ছবিতে নোবেল ও মেয়েটিকে হাসিখুশি অবস্থায় দেখা গেছে। কিছু ছবিতে দুজনকে অন্তরঙ্গভাবেও দেখা গেছে, এ ছাড়াও প্রায় ছবিতেই দেখা গেছে দুজন হেসে একসাথে পোজ দিয়েছেন। এমনকি একটি ছবি দুজনকে একই টি শার্টেও দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনরা বলছেন, এদের দুজনের তো ভালো সম্পর্ক। দুজনে হাসিখুশি। এটা তো কোনোভাবেই অপহরণ ও ধর্ষণ হতে পারে না। এখানে মেয়েটির অনিচ্ছায় কিছুই ঘটেনি। বরং তার স্বার্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নোবেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন। এটা নাটক।
এদিকে নোবেলের স্ত্রী সালসাবিল মাহমুদও বলছেন, কোনো মেয়েকে ৭ মাস ধরে আটকে রাখাটা ভিত্তিহীন। তিনি সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে লিখেছেন, কেউ যদি মনে করে, এই মোবাইল ও প্রযুক্তির যুগে কাউকে ৭ মাস ধরে জোরপূর্বক আটকে রাখা বা এমন অপরাধ সংঘটিত করা সম্ভব, তাহলে সেটি বাস্তবতাবিরুদ্ধ ও সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও হাস্যকর একটি ধারণা।