বিশেষ সংবাদদাতা

‘যে দিকে তাকাই সেদিকেই একটা শব্দ সিন্ডিকেট। মার্কেট ফোর্স যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে কাজ করছে না। সিন্ডিকেটের কারণে বাজার ঠিকভাবে কাজ করছে না’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।

তিনি বলেছেন, আইনের ভেতরেই কিছু একটা করে রাখা হয়েছে। মার্কেট ইকোনমিকে আরো বেশি ইকোনমিক করতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরকে আরো বেশি কার্যকর করতে হবে। আগামী মাসের মধ্যে ন্যাশনাল সিঙ্গেল ইউন্ডো চালু হবে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টন টাওয়ারস্থ ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে ইআরএফ ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএএমএ) যৌথভাবে আয়োজিত ‘এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন অ্যান্ড রুলস অব এগ্রো সেক্টর’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব (সিনিয়র সচিব) শফিকুল আলম, প্যানেল আলোচক ডি-৮ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের মহাসচিব আশরাফুল হক চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থান করেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএএমএ) সভাপতি কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান।

বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, গত সোমবার সন্দীপের ফেরি উদ্বোধন হলো, সেখানেও নাকি সিন্ডিকেট ছিল! আমরা সিন্ডিকেটতন্ত্র থেকে কিভাবে মুক্তি পাব সেটিও ইকোনমিক রিফর্মের একটি অংশ, আর আমরা সেই চেষ্টাই করছি।

তিনি বলেন, আমাদের এলডিসি গ্রাজুয়েশন করতে হবে। আজ কিংবা কাল আমাদের তা করতেই হবে। ইইউর বাজারে আমাদের ডিউটি ফ্রি এক্সেস আছে। তারা বলছে, তোমাদের এত সুবিধা দিচ্ছি, তোমাদের ট্যাক্স-জিডিপি এত কম কেন? প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট এত কম কেন?

তিনি বলেন, ফলে এলডিসি গ্রাজুয়েশন নিয়ে না ভেবে আমাদের ‘ওয়ান বাংলাদেশ’ নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা নিজেরা কতটা উন্নত হতে পারি তা ভাবতে হবে। সরকার, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা কে কী করতে পারি, কী করতে হবে- তা ভাবতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত বলেন, আমাদের এখানে একটি হাব হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ভারত ও চীন হাব হতে পারবে না। কারণ তারা পরাশক্তি। আমাদের এখন সেই চেষ্টা কাজে লাগাতে হবে। এছাড়া আমরা প্রসেসিং সেন্টার করতে পারি। হালাল গোশত অবশ্যই করা যেতে পেরে।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে অবশ্যই পিপল প্রসেসিং করা যেতে পারে। আমরা আমাদের জনগণকে আরো বেশি দক্ষ করে প্রবাসে পাঠাতে পারি।

লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, আমরা প্রথমে দেখেছি, সরকারের ভেতরে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ থাকে না। এক মন্ত্রণালয় আরেক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। আমরা এখন আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করেছি। কোন মন্ত্রণালয়ে কোন কাজ আটকে আছে, আমরা সেখানে তা আলোচনা করি।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ইনভেস্টমেন্ট সামিট এবার একটু ভিন্ন আকারে হবে। সেখানে সেমিনার বা ভাষণ টাইপের প্রোগ্রাম কম থাকবে। কী কী করা যেতে পারে, কেবলমাত্র তা নিয়েই আলোচনা হবে।

তিনি বলেন, দেশের পোশাক খাতে ক্রেতাদের সমস্যা দূর করতে তাদের সাথে আমাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। পোশাক খাতের ক্রেতাদের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর সাথে আমরা এখন প্রতিমাসে একটি বৈঠক করছি। এরইমধ্যে দু’টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে পোশাকখাতের ক্রেতাদের সাথে আর কখনো বৈঠক হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা পোশাক খাতের ব্রান্ডের গ্লোবাল নেতাদের সাথেও যোগাযোগ রাখছি। দেশে থেকে পোশাক খাতের ক্রয়াদেশ অন্যদেশে স্থানান্তর হচ্ছে- এমন একটা কথা শোনা যাচ্ছিল, সেটি এখন আর কেউ বলে না, বলবেও না। বরং কয়েক মাস ধরে দেশের পোশাক খাতের রফতানি আয় বাড়ছে। আইএলও-তে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেটি কিভাবে সমাধান করা যায়, তা নিয়েও আমরা কাজ করছি।

প্রবন্ধে মোস্তাফিজুর রহমান সেক্টরের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এটি দেশের জিডিপির প্রায় ১১.৩৮ শতাংশ প্রদান করে এবং মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫.৪ শতাংশ কর্মসংস্থান করে। উৎপাদনের অন্যতম উপাদান হলো বিভিন্ন ধরণের সার।

তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় উদ্ভিদ পুষ্টির প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধিত হয়নি। আর এসব হলো, ন্যানো প্রযুক্তি সার, তরল সুষম সার, ও অনুজীব সার। এসবের দারুণ অভাব রয়েছে। দেশে মোট ফসলি জমির পরিমাণ ৮১.২৬ লাখ হেক্টর। আমদানিকৃত বীজের জন্য ব্যয় হয় এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। আর বীজগুলো হলো, হাইব্রিড ধান, ভুট্টা, পেঁয়াজ, টমেটো, কুমড়াজাতীয় ফসল, আলু, মূলা, কপি, মরিচ, তৈলবীজ ও অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসল।

কৃষিবিদ মোস্তাফিজ জানান, বালাইনাশকের বিশ্ববাজার ২০২৩ সালে ছিল সাড়ে ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। বালাইনাশক শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ-চায়না (৪০ শতাংশ), যুক্তরাষ্ট্র (২২ শতাংশ), জার্মানি (৮ শতাংশ), ভারত (৭ শতাংশ), জাপান (৫ শতাংশ) এবং অন্যান্য দেশ (১৮ শতাংশ)। সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার বিশ্ববাজার হলো এই বালাইনাশকের। আর একক সোর্স থাকার কারণে পণ্য ক্রয়ে কোন দরদাম করার সুযোগ নেই। কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য সুনিদ্দির্ষ্ট নীতিমালা না থাকা। বাংলাদেশ এর ডিসিভুক্ত দেশ হওয়া স্বত্ত্বেও পেটেন্ট স্বত্ত্ব চাপিয়ে দেয়া।

বিএএমএ সভাপতি বলেন, কাঁচামাল ও সহযোগী উপাদান আমদানির ক্ষেত্রে সোর্স উন্মোক্তকরন। যা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আমদানিতে সহয়তা করবে। কাঁচামাল আমদানিতে সার্বিক সহযোগীতা প্রদান এবং প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সূত্রীতা হ্রাসকরণ। দেশীয় ওষধ শিল্পের মত পেটেন্ট স্বত্ত্ব রহিতকরণ করা দরকার।

তিনি জানান, আইনিসহ বেশ কিছু কারণে স্থানীয়ভাবে বালাইনাশক উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণগুলো হলো, একক উৎস হওয়ায় কাঁচামাল ও সহযোগী উপাদান আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য যাচায়ের কোনো সুযোগ নেই। এখানে সোর্সকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যা বর্তমানে, শর্তসাপেক্ষে অন্য একটি সোর্স সংযোজিত করার সুযোগ থাকলেও উৎপাদনকারীদের জন্য তা কার্যকরী নয়।

মোস্তাফিজ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও আইন বহির্ভূতভাবে পেটেন্ট আইন রোহিত করর, যা ওষুধ শিল্পে আইন অনুযায়ী কার্যকর। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রতিটি আমদানি চালানে এমওএ থেকে প্রি-ইন্সপেকশন ও ‘অনাপত্তি পত্র’ প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রিতা। ফলশ্রুতিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ব্যয় বেশি হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পন্যের দেশীয় আমদানিকারকদের কাছে বিক্রয়ে জটিলতা। প্রাসঙ্গিক বিঁধি বিধান না থাকায় স্থানীয় উৎপাদকগণ দেশীয় বাজার ধরতে না পারায় আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনকারীদের প্রতিনিধি পিটাক কমিটিতে না থাকায় স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে না। নীতিমালা প্রনয়নে জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সোর্সকে উম্মুক্ত করতে হবে।