নব্য হাইব্রিডের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে ত্যাগীরা অভিযোগ করে বিএনপির তৃণমূল নেতারা বলেছেন, ‘৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির মাঠপর্যায়ের চিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া ত্যাগী নেতারা এখন নব্য হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের ভিড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ত্যাগীদের মূল্যায়ন ও নব্য হাইব্রিডদের ভূমিকা নিয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করেন নেতারা।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির বর্ধিত সভার দ্বিতীয় কর্ম অধিবেশনে তৃণমূলের নেতারা এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সভায় দীর্ঘদিন পর কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতারা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সামনে সরাসরি তাদের মতামত ও প্রত্যাশা তুলে ধরেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক অবস্থা, ত্যাগীদের মূল্যায়ন এবং আগামী দিনের করণীয় নিয়ে বিভিন্ন সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়।
এ দিন সকাল ১১টার দিকে সংসদ ভবনের এলডি ভবন প্রাঙ্গণে বিএনপির বর্ধিত সভা শুরু হয়। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন।
সভায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পরই দ্বিতীয় কর্ম অধিবেশন শুরু হয়ে শেষ হয় রাতে।
সবশেষ ২০১৮ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে বিএনপির সর্বশেষ বর্ধিত সভা হয় যেখানে খালেদা জিয়া সভাপতিত্ব করেছিলেন।
বর্ধিত সভার মূল মঞ্চে বিএনপির মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় ভার্চুয়ালি লন্ডন থেকে যুক্ত হন স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বেলা ১১টা ৮ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াত ও মোনাজাত পরিচালনা করেন জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের আহ্বায়ক কাজী মো: সেলিম রেজা। সভা পরিচালনা করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় দুই শতাধিক নেতা ভার্চুায়লি সভায় যুক্ত ছিলেন।
সভায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর ধরে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তারাই এখন নব্য হাইব্রিডদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। অনেক ত্যাগী নেতা দীর্ঘদিন ঢাকায় বা বিদেশে অবস্থান করায় তাদের অবদান সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। আগামীতে জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠনের সময় তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করার জন্য হাইকমান্ডের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।’
তৃণমূলের নেতারা আরো বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে যারা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তারাই এখন আবার সামনে আসছেন। এই নব্য হাইব্রিড ও সুবিধাবাদীদের ভিড়ে ত্যাগীরা যেন হারিয়ে না যান, সেদিকে বিশেষ নজর দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি, বিগত সময়ে দল থেকে বহিষ্কৃত জনপ্রিয় নেতাদের ফিরিয়ে আনারও অনুরোধ করা হয়।’
যুক্তরাজ্য বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল ছাত্তার বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর ধরে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদান যেন আমরা ভুলে না যাই। বাংলাদেশ এখন সঙ্কটময় পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন জরুরি।’
চাঁদপুরের কচুয়া পৌর বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুল্লাহ হাবিব বলেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাদের অবদানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। যারা দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তারা এখন সুবিধাবাদী হিসেবে সামনে আসছেন। ত্যাগীরা যেন তাদের ভিড়ে হারিয়ে না যান।’
নীলফামারী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আল মাসুদ চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর থেকে দলে বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। কিছু সুবিধাবাদী নেতা ত্যাগীদের বিতাড়িত করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। ত্যাগীরা যদি হারিয়ে যান, তাহলে ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য তা ক্ষতিকর হবে।’
রংপুরের গঙ্গাচরা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো: ওহেদুজ্জামান মাহবুব বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলে অতিথি পাখিদের ভিড় বেড়েছে। তাদের ভিড়ে ত্যাগীরা যেন ছিটকে না পড়েন।’
নরসিংদীর রায়পুরা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আজকে অনেকে দূরে সরে আছেন। তাদের ফিরিয়ে আনুন। তিনি আরো বলেন, ৫ আগস্টের পরে অনেকে শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু অনেক কিছু কেন্দ্রের নজরে আসছে না। এতে দলের বদনাম হচ্ছে। এসব বিষয় মনিটরিং করার জন্য ‘বিশেষ কমিটি’ দরকার।’
রাজশাহী মহানগরের বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপি একটি সুশৃঙ্খল দল। কিন্তু অনেকের মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব রয়েছে। সামনে নির্বাচন। নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং মিটিয়ে তৃণমূলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে।’
যশোর অঞ্চলের এক নেতা বলেন, ‘সংগঠনের প্রায় প্রতিটি ইউনিটেই গ্রুপিংয়ের বিষয় রয়ে গেছে। মূলত কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে এমনটা হচ্ছে। গ্রুপিং মিটিয়ে ফেলতে হবে। নির্বাচন নিয়েও অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ঐক্যবদ্ধভাবে সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে আগামী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে হবে।’
সভায় লটারির মাধ্যমে তৃণমূলের প্রায় একশ’র বেশি নেতা তাদের মতামত তুলে ধরেন। আগামী দিনের কর্মকৌশল নির্ধারণে এই মতামতগুলো আমলে নেয়া হবে বলে জানানো হয়। বিএনপির হাইকমান্ড এখন ত্যাগীদের মূল্যায়ন ও নব্য হাইব্রিডদের ভূমিকা নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন, তা এখন দেখার বিষয়।