রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশ।

রোববার (১ফেব্রুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে প্রথম আইন ছিল ১৯৮৩ সালের মোটর ভেহিকলস অর্ডিন্যান্স। ওই আইনে সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বহু ঘাটতি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ২০১২ সালে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়। পরে ২০১৬ সালে সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ নামে একটি খসড়া চূড়ান্ত হলেও তা তখন পাস করা সম্ভব হয়নি।

বক্তারা জানান, ২০১৮ সালে ঢাকায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মোটর ভেহিকলস অর্ডিন্যান্স বাতিল করে ‘সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়। তবে ওই আইনে সড়ক নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় এবং সময়মতো বিধিমালা জারি না হওয়ায় আইনটির কার্যকর প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা–২০২২’ জারি করে। কিন্তু বিধিমালায় সড়ক নিরাপত্তা বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ থাকায় সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও আহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা আরো বেশি। প্রতিবছরই সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, যা অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।

বক্তারা বলেন, দেশের বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮ মূলত পরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে প্রণীত। এতে বেপরোয়া গতি, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা তদন্ত ও তথ্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পাশাপাশি জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত ‘ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি ২০২১–২০৩০’-এর পাঁচটি মূল স্তম্ভের সাথেও বর্তমান আইন পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ অবস্থায় বক্তারা বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাবিত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’র আলোকে একটি পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন জরুরি। এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, সড়ক ব্যবহারকারীর ভুল হলেও সড়কব্যবস্থা এমন হবে যাতে মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের মতো চরম পরিণতি না ঘটে। বিশ্বের অনেক দেশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করে সড়কে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে।

রোড সেফটি কোয়ালিশন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব কমানো, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৩.৬ ও ১১.২ অর্জন এবং ২০২৫ সালে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত চতুর্থ গ্লোবাল মিনিস্ট্রিয়াল কনফারেন্স অন রোড সেফটিতে বাংলাদেশের দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য একটি আলাদা সড়ক নিরাপত্তা আইন অপরিহার্য।

সংবাদ সম্মেলন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়, তারা যেন আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচের আলোকে একটি পৃথক ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করে।

অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) রোড সেফটি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক কাজী বোরহান উদ্দিন, মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ এম খালিদ মাহমুদ । এতে বক্তব্য দেন গ্লোবাল হেলথ এডভোকেসি ইনকিউবিটরের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর ড. মো: শরিফুল আলম, রোড সেফটি বিশেষজ্ঞ এম খালিদ মাহমুদ, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার, বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ডা: মাহফুজুর রহমানসহ কোয়ালিশনের বিভিন্ন সদস্য সংস্থার প্রতিনিধিরা।