বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম পরিপালন করতে গিয়ে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন রাজধানীর সোনালী ব্যাংক লক্ষ্মীবাজার শাখার ব্যবস্থাপক মো: জহিরুল ইসলাম সুমন। তুচ্ছ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের এমডি বরাবর নিজের শ্লীলতাহানির অভিযোগ দেন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের চিকিৎসক ডা: শাহারিয়া খানম। তবে ব্যাংকের তদন্ত ও ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ডা: শাহরিয়ারের অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ডকুমেন্টারি ভিডিও প্রকাশ করেন সাংবাদিক মো: মিজানুর রহমান (মাসুম মিজান)। যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং সবার সামনে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ পায় । এ ঘটনা আড়াল করতে উল্টো ব্যাংক ম্যানেজার ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মানহানি মামলা করেন ডা: শাহারিয়া।

জানা গেছে, ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতালতে গত ১১/১১/২০২৫ তারিখ দায়ের করা সিআর মামলাটির (৩৭৫/২৫) তদন্তভার দেয়া হয় সুত্রাপুর থানা পুলিশকে। গত ৫ মার্চ মামলার তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। প্রতিবেদন জুড়ে প্রকৃত ঘটনার সঠিক উপস্থাপন থাকলেও শেষে সমন্ময়হীনভাবে উল্টো মতামত প্রাদান করা হয়েছে। যাতে একই তদন্তের দ্বিমুখী বা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিদ্যমান।

পুলিশের তদন্ত ও সোনালী ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবদন এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ঘটনার শুরু গত বছর ৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে রাজধানীর সোনালী ব্যাংক লক্ষ্মীবাজার শাখায়। ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার ডা: শাহারিয়া খানম অপর একজনের একাউন্টে ৭৫ হাজার টাকা পাঠাতে আসেন। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে জানান, ৫০ হাজার টাকার বেশি কোনো হিসাবে পাঠাতে প্রেরকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দেয়ার বিধান বাংলাদেশ ব্যাংকের। কিন্তু ডা: শাহারিয়া খানম পরিচয়পত্র ছাড়াই টাকা পাঠাতে চাপ দেন ওই কর্মকর্তাকে। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে শাখা ব্যবস্থাপক মো: জহিরুল ইসলাম সুমন বিষয়টি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেন। ততক্ষণে ডা: শাহারিয়া উত্তজিত হয়ে হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি বেসামাল করে তোলেন। তার টাকা জমা নিতেই হবে বলে তিনি প্রভাবশালীদের নামকরে ভয়ভীতি দেখান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে প্রভাশালীদের কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনে ধরিয়ে দেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত একাধিক গ্রাহক ডা: শাহারিয়াকে শান্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ম্যানেজারের কক্ষে তাকে অবরুদ্ধ করেন ডা: শাহারিয়া এবং জোর করেন জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই টাকা জমা নিতে। এ সময় দরজার সামনে দাড়িয়ে ম্যানেজারকে কক্ষ থেকে বের হতে বাধা দেন। তখন সেলিম মিয়া নামে এক গ্রাহক দরজা খুলে অবরুদ্ধ ম্যানেজারকে বের করে আনেন।

অথচ এই ঘটনাকেই নিজের শ্লীলতাহানি বলে ডা: শাহারিয়া লিখিত অভিযোগ দেন সোনালী ব্যাংক এমডি বরাবর। এতে পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগতভাবে বিতর্কের মুখে পড়েন ম্যানেজার মো: জহিরুল ইসলাম সুমন। নির্ভরযোগ্য সোর্সের মাধ্যমে জেনে ঘটনাটি অনুসন্ধান করে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রফেশনাল প্রোফাইলে প্রকাশ করেন সাংবাদিক মো: মিজানুর রহমান (মাসুম মিজান)। ঘটনার ১৬ দিন পর প্রকাশিত ডকুমেন্টারিতে প্রকৃত সত্য সবার সামনে চলে এলে ভুক্তভোগী ম্যানেজার সুমন নিজের সম্মান ফিরে পান এবং প্রথম ধাক্কায় কিছুটা রক্ষা মেলে।

একইসাথে ব্যাংকের এমডির নির্দেশে দ্রুত কাজ শুরু করে ঘটনা তদন্তে গঠিত দল। এ তদন্ত প্রতিবেদনেও শ্লীলতাহানির অভিযোগটি মিথ্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ব্যাংকের তদন্ত চলাকালে ডা: শাহারিয়া সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন বলেও আভিযোগ পাওয়া গেছে।

ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঘটনার সময় প্রভাব দেখিয়ে ডা: শাহারিয়া যাদের দিয়ে ম্যানেজারকে হুমকি দিয়েছেন, তারা হলেন- সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের এসপিও মোহাম্মদ ইউসুফ দেওয়ান এবং ডিজিএম মো: গোলাম হাসান। পরবর্তীকালে তাদের চাপেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম ভেঙে টাকা জমা নিতে বাধ্য হন শাখার ম্যানেজার। ডা: শাহারিয়ারের হট্টগোলকে কেন্দ্র করে দিনের ব্যস্ত সময়ে শাখার স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রায় ৩০ মিনিট অচলাবস্থার মুখে পড়ে।

এদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষে শাখা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় আদালতে মানহানীর মামলা করেন ডা: শাহারিয়া, তার বিরুদ্ধে ভিডিও প্রকাশের অভিযোগে।

অপরদিকে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে প্রকৃত ঘটনার সঠিক চিত্র। পুলিশ বলেছে- একজন ভুক্তভোগী ব্যাংকারকে রক্ষার জন্য সাংবাদিক পেশাগত কারণে ভিডিওটি প্রকাশ করেছেন। সেদিন কী কী হয়েছে ঘটনাস্থলে এবং কেন হয়েছে তাও পুলিশের প্রতিবেদনে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ বর্ণনায় একরকম বলে গিয়ে তদন্তের মতামতে এসে পুলিশের বক্তব্য কিছুটা উল্টে গেছে।

প্রতিবেদনে একাধিকবার পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, সাংবাদিক ও ব্যাংকারের মধ্যে কোনো যোগসাজশের মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার শেষে বলা হয়েছে, বাদিনীর অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান।

সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, যেহেতু ডা: শাহারিয়া শেষ পর্যন্ত প্রভাব খাটিয়ে ম্যানেজারকে টাকা জমা নিতে বাধ্য করেছেন, সেহেতু তিনিই তো জিতেছিলেন। তুচ্ছ ঘটনাটি সেখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু তিনি থেমে না গিয়ে নারীর সবচেয়ে চূড়ান্ত অস্ত্র শ্লীলতাহানির অভিযোগ করলেন। তখন ঘটনার ভিডিও পাবলিক না হলে শুরুতেই ম্যানেজারের বড় ক্ষতি হয়ে যেতো। এ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ মোকাবেলায় বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছেন ভুক্তভোগী ম্যানেজার সুমন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে টাকা জমা নিতে চাওয়াই এখন তার কাল হলো। ডা: শাহারিয়া শুরুতে এমডির কাছে শ্লীলতাহানির অভিযোগ দিলেও পরে আদালতে মামলা করছেন মানহানীর, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন করছেন ভুক্তভোগীরা।