বিশ্ব ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন রক্ষায় বনরক্ষীদের নজরদারি ও প্রতিনিয়ত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বনের গহীনে যেসব স্থানে নৌ-যান অচল, সেসব জায়গায়ও পায়ে হেঁটে অর্থাৎ ফুট পেট্রোলিং এর মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া যেখানে ফুট পেট্রোলিংও সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন উড়িয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। সর্বোপরি নানা ধরনের অভিযান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বন অপরাধ দমনে পশ্চিম বিভাগে অনেকটাই সফলতা এসেছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, লোকবল সঙ্কট, উন্নত জলযানের অভাব এবং আধুনিক সুযোগ সুবিধা না থাকলেও বনকে নিরাপদ রাখতে নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বনের অতন্দ্র প্রহরীরা।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ১ বছরে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে বিভিন্ন সাঁড়াশি অভিযানে ২৯৪টি মামলায় ৩৯৬ জন বন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের গোশত এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ মৎস্য ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম।

একইসাথে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ করতে এর সাথে জড়িত ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এতে বন অপরাধ বিগত দিনের তুলনায় অনেক কমে আসছে।

সূত্র জানায়, বন বিভাগ ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে সুন্দরবনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা বনের গহীনে পায়ে হেঁটে ও জলপথে এই অভিযানে অংশ নেন। এই ১ বছরে বন অপরাধের দায়ে খুলনা রেঞ্জে মোট ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৯৬ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া পলাতক আসামি রয়েছে ৬৩ জন। এর মধ্যে অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১০৬টি। বিষ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩টি।

খুলনা রেঞ্জের অধীন বনের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে গত ১ বছরে উদ্ধার করা সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার (আটন) ফাঁদ, ৯ হাজার ৮৩৩ মিটার দৌনদড়ি, ২ হাজার ৬১২ কেজি মাছ এবং ১ হাজার ৯৮১ কেজি অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া।

এছাড়া সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারি চক্রের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ সময় দস্যু ও অসাধু চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮৭ বোতল মাছ ধরার অবৈধ কীটনাশক, জব্দ করা হয়েছে ২০৩ কেজি মধু। হরিণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩টি। অভিযানে জব্দ করা হয় ৪৮৭ কেজি হরিণের গোশত ও ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট টহল টিম ও বিশেষ টহল টিম মোতায়েন এবং ফুট প্রেট্রোলিং করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অপরাধ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে জেলেদের আগ্রাসী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা বন অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। লোকবল সঙ্কট ও আধুনিক জলযানের অভাবে বিশাল এই সম্পদ পাহারা দিতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে বনকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেই সাথে বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বনের উপর চাপ কমছে না। ফলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিনরাত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, বনের গহীনে ফুট পেট্রোলিং ও আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোন উড়িয়ে অপরাধী শনাক্ত এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বন অপরাধ দমনে সফলতা এসেছে। সর্বোপরি, বনরক্ষীরা ভয়াবহ ঝুঁকি ও কষ্ট মাথায় নিয়ে দুর্গম বনে পায়ে হেঁটে এবং নদীতে নৌ-যান চালিয়ে নিয়মিত টহল দেয়ায় বন অপরাধ বেশির ভাগই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যেকোনো উপায়ে সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখতে বন বিভাগ সদা জাগ্রত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র : বাসস