ঢাকার ফুটপাতের হকারদের পুনর্বাসনে ছয়টি খোলা মাঠে অস্থায়ী মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।

প্রশাসক জানান, নির্ধারিত এসব স্থানে হকারদের নিবন্ধনের মাধ্যমে বসানো হবে এবং একটি নির্দিষ্ট ফি আদায়ের মাধ্যমে স্থানগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।

আজ শনিবার সকালে গুলশানের একটি হোটেলে ‘ঢাকা কি মৃত নগরী হতে যাচ্ছে? সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক এক নগর সংলাপের প্রধান অতিথির বক্ত্যবে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান এসব কথা বলেন।

নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম বাংলাদেশ আয়োজিত এ নগর সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি মতিন আব্দুল্লাহ।

ঢাকা উত্তরের প্রশাসক বলেন, ‘ফুটপাতে আগে যেখানে ২০০ হকার ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজারে দাঁড়িয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ ভয়াবহে পৌঁছেছে। এমনকি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুই শতাংশ মানুষের কারণে ৯৮ শতাংশ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। আমরা ঢাকার এই কয়েকজন হকারের জন্য পুরো ঢাকাবাসীর ভোগান্তি হোক সেটা কোনোভাবেই চাই না। নির্দিষ্ট জায়গায়ই তাদের বসতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পরে দোকান সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দোকানগুলো ট্রলির আদলে তৈরি হতে হবে, কোনোভাবে স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা করা যাবে না।’

শফিকুল ইসলাম খান আরো বলেন, ‘নগরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা যা করি, তার বেশির ভাগই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।’ ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন এবং খালগুলো পরিষ্কারের ক্ষেত্র জনগনের সম্পৃক্তা থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মিরপুরের প্যারিস খাল গত দুই মাসে সাতবার পরিষ্কার করলেও তা আবার নোংরা করে ফেলে। আমরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে খালের পাড়ের যারা বর্জ্য ফেলে তাদেরকে জরিমানার আওতায় আনা যায় কি না সেটা নিয়ে ভাবছি।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান ইমনের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নগর অধিকার কর্মী ও গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত।

সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ‘ঢাকা শহর বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি, যা একে একটি ‘মৃত নগরীর’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বুড়িগঙ্গাসহ চারপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণে কার্যত মৃত হওয়ায় ঢাকা এখন পানির জন্য দূরবর্তী মেঘনা নদীর ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে একটি ‘সমন্বিত নগর শাসন কাঠামো’ এবং ‘আইনের কঠোর প্রয়োগ’ নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরো বলেন, বায়ুদূষণ এখানে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি এবং শব্দদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ‘নীরব ঘাতক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং নেতৃত্বের সক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই ঢাকাকে বাঁচানো সম্ভব। ঢাকাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে এখনই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় এই মেগাসিটি অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়বে।

সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘নগর সেবাগুলোকে এক ছাতার নিচে আনা গেলে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং সেবার মান বাড়বে। তথ্যের ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।’

কড়াইল বস্তি নিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘কড়াইলে বহুতল ভবন নয়, বস্তি বহাল রেখেই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী কড়াইল বস্তির বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন, এজন্য রাজউকের পক্ষ থেকে আমরা সেখানে বারবার গিয়েছি, বস্তিবাসী সেখানে বহুতল ভবন চান না বলেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে পার্কিং স্পেস উদ্ধারে কাজ চলছে। যেসব ভবন পার্কিং এর স্থানে অবকাঠামো করে রেখেছেন তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। এ সময় তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি পূর্বাচল প্রকল্পকে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা ওয়াসার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন স্থানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণাধীন থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দেখা গেছে একই প্রকল্প পাঁচ বছরে শেষ করার কথা থাকলেও সেটি ১২ বছর লেগে যায়। এতে করে কোনো কাজ সময় মতো করতে পারছি না। আমরা মেঘনা, শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে পানি আনছি। প্রায় ৫১ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ১৫০ কিলোমিটার করা হবে। বাধ্য হলে বঙ্গোপসাগর থেকে পানি আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’

স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান বলেন, ‘শুধু কাগজে পরিকল্পনা থাকলে হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজধানীর বেশির ভাগ সুবিধা গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত ৫ শতাংশ মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ, অথচ কড়াইল বস্তির মতো এলাকায় সেই সুবিধা পৌঁছায়নি। আমরা শুধু পরিকল্পনাই করছি কিন্তু কোনো বাস্তবায়ন নাই।’

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্লানার ধ্রুব আলম বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী গণপরিবনের জন্য ২০ বছরের একটি পরিকল্পনার কাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন বাস মালিক সংগঠনগুলোর সাথে আমরা সমন্বয় করে ঢাকার ৪২টি রুট থেকে কমিয়ে ৩২টিতে আনার চেষ্টা করছি। একটি রুটে এক কোম্পানিরই বাস চলবে। এভাবে বাস চলাচল হলে ঢাকার গণপরিবহন শৃঙ্খলা হবে। এ বছরের মধ্যেই এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস রুটে নামানো হবে।’

এছাড়াও অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, পরিবেশবিদ আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম প্রমুখ।