ডায়াবেটিস মানেই আতঙ্ক। টাইপ ১, ২ ও ৩ ডায়াবেটিসের নামই এত দিন জানা ছিল। এখন হঠাৎ করেই টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশন’ (আইডিএফ) গত কয়েক দিন ধরেই এই রোগটি নিয়ে সতর্ক করছে।

তারা জানিয়েছে, নতুন ধরনের ডায়াবেটিসে নাকি শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত ২ থেকে ৩ কোটি শিশুর মধ্যে এই ধরনের ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে।

টাইপ ৫ ডায়াবেটিস আসলে কী?

ডায়াবেটিস বলতে যা ধারণা ছিল এত দিন, এই রোগটি তার থেকে আলাদা। সহজ করে বললে, টাইপ ১ ডায়াবেটিস হলো অটোইমিউন ডিজঅর্ডার। মূলত জিনগত সমস্যার জন্য হয়। অগ্ন্যাশয়ে অবস্থিত ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে যখন মানুষের শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়, সে অবস্থাকে টাইপ ১ ডায়াবেটিস বলা হয়।

আর টাইপ ২ হয় খাদ্যাভ্যাস বা ওজন-সংক্রান্ত কারণে। এক্ষেত্রে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, কিন্তু শরীর ইনসুলিন গ্রহণে বাধা দেয়। অর্থাৎ ইনসুলিন হরমোনকে পুরোপুরি ব্রাত্য করে দেয় শরীর, তখন গ্লুকোজ জারিত হতে পারে না, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে।

টাইপ ৩ ডায়াবেটিসে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। অ্যালঝাইমার্সের রোগীদের এই ধরনের ডায়াবেটিস হতে দেখা যায়।

এটা গেল চেনা ডায়াবেটিসের কারণ। আর টাইপ ৫-এর ক্ষেত্রে এসব কিছুই হয় না। এটি মূলত হয় অপুষ্টির কারণে। অস্বাস্থ্যকর খাওয়া-দাওয়া, সঠিক পুষ্টির অভাবে শরীরে ইনসুলিন তৈরিই হতে পারে না। তখন রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে।

আইডিএফ-এর গবেষকেরা জানাচ্ছেন, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস হঠাৎ করে হয় না। অর্থাৎ অস্বাস্থ্যকর খাওয়া-দাওয়া শুরু করলেন মানেই যে এই ডায়াবেটিস হবে, তা নয়। বছরের পর বছর ধরে অপুষ্টির শিকার হলে, তখন এই রোগ হবে।

ভারত ও আফ্রিকার মতো দেশে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি বলেই জানিয়েছেন গবেষকেরা। সচেতনতার অভাবে এই রোগটি ধরাই পড়েনি এত দিন।

নতুন রোগ নয়

১৯৫৫ সালে জামাইকায় রোগটি প্রথম ধরা পড়ে। আইডিএফ-এর প্রেসিডেন্ট পিটার শোয়ার্জ জানিয়েছেন, জামাইকায় যখন রোগটি ধরা পড়ে, তখন মনে করা হয়েছিল, এটি অপুষ্টিজনিত কোনো অসুখ। এটিও যে ডায়াবেটিসের একটি রূপ, তা বুঝতেই পারেননি চিকিৎসকেরা।

১৯৮৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিসকে ‘বিরল রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, কিন্তু তথ্যের অভাবে রোগটি তাদের তালিকা থেকে বাদ যায় ১৯৯০ সালে। এরপরে ২০২২ সালে ভেলোরের ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক নিহাল টমাস রোগটির ব্যাপারে তার গবেষণাপত্রে লিখেছিলেন।

তিনি জানান, অপুষ্টিজনিত কারণেও ডায়াবেটিস হয়। কিন্তু তথ্যের অভাবে সেটি নিয়ে আর চর্চা হয়নি।

বর্তমানে নিউইয়র্কের অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অফ মেডিসিনের চিকিৎসক মেরেডিথ হকিংস রোগটি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নতুন রোগ নয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। বর্তমান সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। কেবল রোগটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা প্রয়োজন।

চিকিৎসা কী আছে?

টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের উপসর্গও অনেকটা একই রকম। ওজন কমে যাবে বা বেড়ে যাওয়া, বারে বারে প্রস্রাব পাওয়া, অতিরিক্ত পানি পিপাসা, রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠা-নামা করা, হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেবে। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তি কমবে, স্নায়বিক রোগও দেখা দিতে থাকবে।

টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়নি। যেহেতু রোগটি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য ছিল না, তাই এটির তেমন কোনো চিকিৎসা নেই এখন পর্যন্ত।

গবেষকেরা জানাচ্ছেন, টাইপ ৫ ডায়াবেটিস প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগটির শনাক্তকরণের পদ্ধতি ও প্রতিরোধ করার উপায় বের করার চেষ্টা চলছে। সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা