‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক নীতি সংলাপে চিকিৎসক, সিভিল সোসাইটির সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ওষুধ বিজ্ঞানী, ওষুধ উৎপাদক ও আইন প্রণেতারা বলেছেন, বাংলাদেশে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রেখেই ওষুধ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে আইন প্রণেতার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) সংসদীয় আসনের এমপি ডা: মুসলেহ উদ্দিন ফরিদ, জাতীয় অধ্যাপক ডা: একে আজাদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন এমেরিটাস অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান, ড্যাব মহাসচিব ডা: জহিরুল ইসলাম শাকিল, এনডিএফ জেনারেলর সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা: মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন, সহ-সভাপতি কায়সার কবির, কোষাধ্যক্ষ মো: মিজানুর রহমান, জনস্বাস্থ্যবিদ ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক, ঢাবির ফার্মেসি অনুষদের বর্তমান ডিন ড. মো: সেলিম রেজা, জনস্বাস্থ্যবিদ ডা: মোশতাক হোসেন, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশস্থ প্রতিনিধি ডা: মামুনুর রহমান মালিক, অধ্যাপক ডা: সদরুল আলম প্রমুখ।
বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
ডা: মুসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, সরকার এক লাখ ২২ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা রেখেছেন ভর্তুকির জন্য কিন্তু এতে অত্যাবশ্যক ওষুধ স্থান পায়নি। তবু অত্যাবশ্যক ওষুধের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে হবে যেন মানুষ কিনতে পারে। একইসাথে ওষুধ শিল্পকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, এ বছরে স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তা থেকে গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে যেন আমরা নিজেরাও এ শিল্পকে কিছু দিতে পারি।
তিনি বলেন, গত বছর স্বাস্থ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল কিন্তু ১৪ হাজার কোটি টাকা ফেরত গেছে। সরকারি বরাদ্দকৃত টাকাও খরচ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
অধ্যাপক একে আজাদ খান বলেন, ড্রাগ কন্ট্রোল অথোরিটিকে প্রফেশনাল হতে হবে। পৃথিবীর কোথাও ডাক্তারদের বিনা পয়সায় ওষুধ দেয়া হয় না। বাংলাদেশে এটা হয়, এটা অবৈধ।
অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, কোয়ালিটি প্রোডাক্ট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ দাম নির্ধারণ করতে হবে। নিম্ন দাম নির্ধারণ করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। এমআরপি তুলে দেয়া হোক। কোনো এসেনশিয়াল ড্রাগ থাকলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। আর প্রেসক্রিপশনের জন্য ওষুধ কোম্পানি চিকিৎসকদের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে সেটি বন্ধ করে দিলে ওষুধের দাম কমিয়ে আনা সম্ভব।
মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ইন্ডাস্ট্রির টিকে থাকা দরকার আছে; একইভাবে উৎপাদনকেও শক্তি দিতে হবে।
ডা: মুশতাক হোসেন বলেন, পৃথিবীর কোথাও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করার নজির নেই। ২০২৬ সালে যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করা হয়েছে, সেটিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের অর্ধেক মাত্র। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতিমালার আলোকে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। আবার দেশীয় কোম্পানিগুলোর ওষুধের উচ্চ দাম নির্ধারণ করা হলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সুবিধা পাবে। দেশীয় ওষুধশিল্পকেও সুরক্ষা দিতে হবে।
ডা: জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, রোগীর নাগালে ওষুধ বলতে আমি বুঝি আয় অনুযায়ী। ৫৪ বছরে আমাদের একটি ওষুধনীতি ও স্বাস্থ্যনীতি নেই। আমি চাই, সবার আগে জাতীয় ওষুধনীতি ও স্বাস্থ্যনীতি হোক। আজকের আলোচনায় যে প্রস্তাবনা আসছে, সেগুলো কম্পাইল করে দেয়া হলে আমি সরকারকে দেব।
অধ্যাপক ডা: মাহমুদ হোসেন ওষুধ কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে বলেন, আপনাদের কাছে কে গিফট চেয়েছে? কেন আপনারা ডাক্তারদের গিফট করেন? বন্ধ করুন এসব। এসব বন্ধ করলে এসেনশিয়াল ড্রাগসের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ৩-৪ হাজার কোটি টাকা প্রেসক্রিপশন বাবদ চলে যায়; এটি দুঃখজনক।
আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের সেকশন ১৩-তে একটি মেকানিজম তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি কার্যকর করা হয়নি। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর তালিকা প্রকাশ এবং দুই বছর পর পর হালনাগাদ করার কথা বলা হয়েছিল। এটি হলে অনেক সঙ্কট থাকত না। এ জন্য জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেটি গঠন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তারা মূল্য নির্ধারণ করে। বর্তমান সরকার এসে ২৪ সদস্যবিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে। আগস্ট মাসে এসে ওই তালিকা বাতিল করে দেয়। হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, ৭৩৯-কে ১১৭-তে রূপান্তর করাটা অসাংবিধানিক।
অধ্যাপক ডা: মোজাহেরুল হক এ ধরনের পলিসি ডায়ালগ সিরিজ আকারে করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিজনেস এথিকসের বিবেচনায় ডাক্তারের ছেলের বিয়ের হলরুম বুক করে দেয়া বা বিদেশ পাঠানোর জন্য যে টাকা দেয়া হয়, তা ঘুষ। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। দাবি উঠলেই মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়। বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও নার্স শিক্ষার মান সর্বকালের সর্বনিম্ন। পৃথিবীতে কোনো উন্নত জাতি নেই, যারা স্বাস্থ্যবান জাতি নয়। সুতরাং স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও পাবলিক হেলথ উন্নত করা প্রয়োজন।
সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ওষুধের মূল্য যতটা সম্ভব কম রাখাই ওষুধনীতির একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না; বরং এমন একটি নীতিকাঠামো প্রয়োজন, যেখানে রোগী প্রয়োজনীয় ওষুধ সামর্থ্যের মধ্যে পাবেন এবং একইসাথে উৎপাদক মানসম্মত ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ টেকসইভাবে অব্যাহত রাখতে পারবেন। এ জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য নির্ধারণ, নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং রোগীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।