যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডেকোটা অঙ্গরাজ্যে এক গৌরবময় ইতিহাস রচনা করেছেন বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও লার্নিং ডিজএবিলিটি বিশেষজ্ঞ তোরসা জহুর। ‘গ্রেটার গ্র্যান্ড ফোর্কস ইয়াং প্রফেশনালস’ (GGFYP) তাকে সম্মানজনক "২০২৬ ইয়াং প্রফেশনাল অব দ্য ইয়ার" (Young Professional of the Year) পদকে ভূষিত করেছে। গত ৩ মার্চ, ২০২৬ তারিখে The Olive Ann Hotel এ অনুষ্ঠিত জমকালো এক অনুষ্ঠানে সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট Brenna Mathiason কাছ থেকে তিনি এই পুরস্কার গ্রহণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি গত ২৮ ও ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে গ্রান্ড ফর্ক্স শহরের এলেরাস সেন্টারে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ইয়াং প্রফেশনাল সামিটে অংশগ্রহণ করেন।

এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কেবল তার ব্যক্তিগত মেধার স্বাক্ষরই বহন করে না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব ও যোগ্যতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার এই আঞ্চলিক সংগঠনটি প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য ও কমিউনিটির উন্নয়নে অনন্য অবদান রাখা অনূর্ধ্ব-৩০ বছর বয়সী সেরা তরুণদের এই পুরস্কারে ভূষিত করে। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্র্যান্ড ফোর্কস অঞ্চলের শিক্ষা ও সামাজিক পরিকাঠামোতে গভীর প্রভাব ফেলার স্বীকৃতিস্বরূপ তোরসাকে এই সম্মাননার জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত করে সংগঠনের পরিচালনা পর্ষদ।

তোরসা জহুরের এই সাফল্যের সূচনা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার্স বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাস্টার্স (MSS) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার এই ক্লিনিক্যাল ভিত্তিকেই তিনি পরবর্তীতে তার জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ডেকোটা (UND)-তে ‘টিচিং অ্যান্ড লিডারশিপ’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সফল টিচিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন।

তোরসার মূল কাজের ক্ষেত্র হলো ‘ডিজিটাল একসেসিবিলিটি এবং লার্নিং ডিজএবিলিটি’ (শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতা)। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা যাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমান সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনলাইন শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) করতে তিনি শিক্ষকদের জন্য তৈরি বিভিন্ন ডিজিটাল লার্নিং ম্যাটেরিয়ালস বা পাঠদান উপকরণ নিয়মিত রিভিউ এবং পরিমার্জন করছেন। তার এই কাজের মূল লক্ষ্য হলো কোনো শিক্ষার্থী যেন তার শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে শিক্ষার মূল ধারা থেকে ছিটকে না পড়ে।

লার্নিং ডিজএবিলিটি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিয়ে তোরসা জহুরের তৈরি একাধিক সচেতনতামূলক ও গবেষণামূলক প্রদর্শনী (Exhibitions) ইতোমধ্যে গ্রান্ডফর্ক্স হেরাল্ডসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রচারমাধ্যমে বেশ প্রশংসার সাথে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে ডিসগ্রাফিয়া (লেখার সমস্যা) এবং অন্যান্য শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতার ওপর তার সুনির্দিষ্ট কাজ ও বাস্তবমুখী উপস্থাপনা মার্কিন শিক্ষাবিদদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

পুরস্কার প্রাপ্তির পর এক প্রতিক্রিয়ায় তোরসা জানান, এই প্রাপ্তি তার কাজের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষকতা, শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতা এবং ডিজিটাল একসেসিবিলিটি নিয়ে তিনি যে টেকসই মডেল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) প্রযুক্তিভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছেন, এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি বিশাল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

তোরসা জহুরের এই আন্তর্জাতিক অর্জন প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা ও একাগ্রতা থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের যেকোনো উন্নত দেশের নীতি নির্ধারণী ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারে। দেশের সীমানা পেরিয়ে আমেরিকার মাটিতে বিশেষ শিক্ষা ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তোরসার এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ ফ্রন্টলাইনারের জন্য এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।