বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঘোষিত নতুন কমিটি নিয়ে ফেসবুকে নেতিবাচক পোস্টের জেরে ছাত্রলীগের হুমকির সম্মুখীন হয় জুলাই আন্দোলনকারী মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
মিরাজুল বুটেক্সের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বুটেক্স জুলাই কালচারাল সেন্টারের সক্রিয় সদস্য।
এর আগে, গত সোমবার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে মো: জাহিদ হাসান জয় সভাপতি ও আলী মাহমুদ হাসান প্রতীককে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগ বুটেক্স শাখার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সমালোচনা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে জানিয়ে মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি দাবি করেন, ঘোষিত কমিটিতে থাকা বুটেক্সের চার সদস্যের বিরুদ্ধে তিনি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে হুমকি দেয়া শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও শুরুতে হুমকিগুলো সীমিত পর্যায়ের ছিল বলে জানা যায়।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার তিনি আরেকটি ফেসবুক পোস্ট করেন। পোস্টে ঘোষিত কমিটিতে থাকা বুটেক্সের চার সদস্যের নাম ও ছবি প্রকাশ করে সমালোচনা করেন। সেইসাথে তাদের চিনে রাখার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান ক্যাম্পাসের জুনিয়রদের উদ্দেশে।
এই পোস্ট প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তার পোস্টের কমেন্ট সেকশনে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো পেজ থেকে হুমকিমূলক মন্তব্য করা হয়।
এছাড়া ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজে মিরাজুলের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হুমকিমূলক মন্তব্য করতে দেখা যায়। এমনকি তার ব্যক্তিগত ইনবক্সেও একাধিক ব্যক্তি মৃত্যুর হুমকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘জুলাইকে আমি এখনো নিজের মধ্যে ধারণ করি। বুটেক্সে যেহেতু ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ সেই ক্যাম্পাসে যখন একটা নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন পুনরায় সচল হওয়ার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে কথা বলাটা আমি আমার নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে মনে করি। তবে এরপর থেকে আমাকে বিভিন্ন হুমকির শিকার হতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে মাদক বিক্রির সাথে জড়িত হিসেবে পরিচিত শাকের আহমেদ ফাহাদ সরাসরি ইনবক্সে আমাকে হুমকি দেয়ার চেষ্টা করেছে। এছাড়াও অনলাইনে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পেজে পোস্টের মাধ্যমে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমনকি আমার পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের নামেও বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করা হচ্ছে এসব পেজ থেকে। আপাদত সার্বিক নিরাপত্তার কথা ভেবে আমার ফেসবুক প্রোফাইলটি লক করা আছে এবং পরে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় সে বিষয়ে আমার পরিবারের সাথে আমি আলোচনা করছি।’
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মানেজমেন্ট বিভাগের ৪৯তম ব্যাচে শিক্ষার্থী মোস্তাকিম বিল্লাহ বলেন, ‘বুটেক্সের সাধারণ শিক্ষার্থী এবং জুলাই আন্দোলনের একজন যোদ্ধাকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হুমকি দেয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং নিন্দনীয়। তাদের যেকোনো একজনকে হুমকি দেয়া মানে পুরো সাধারণ শিক্ষার্থী সমাজকে হুমকি দেয়া। যেহেতু ছাত্রলীগ একটি সরকারিভাবে নিষিদ্ধ সংগঠন, তাই তাদের যেকোনো ধরনের তৎপরতা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আর্থিক রাদিয়ান বলেন, ‘ছাত্রলীগের মতো একটি সহিংস সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর অন্যায়, নিপীড়ন ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি করে এসেছে। জুলাই আন্দোলনের একজন যোদ্ধার বিরুদ্ধে এই হুমকি প্রমাণ করে যে তারা এখনো সেই আন্দোলনের চেতনা ও অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি প্রশাসনের কাছে এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
এর আগে ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘বুটেক্সে এই মুহূর্তে সকল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যদি এখানে কোনো রাজনৈতিক কর্যক্রম পরিচালনা করতে চায় তবে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
উল্লেখ্য, মিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। এছাড়া বুটেক্সে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে একাধিক কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।