পবিত্র রমজান মাসে দেশে প্রতি লিটার দুধ যখন ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তখন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে প্রতি লিটার দুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ টাকা করে। হ্যাঁ, এটাই সত্যি। তবে সারা করিমগঞ্জ উপজেলায় ১০ টাকা লিটারে দুধ বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি হচ্ছে শুধু একটি খামারে। খামারটির নাম ‘জেসি অ্যাগ্রো ফার্ম’। এটির অবস্থান করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের রৌহা গ্রামে।

রমজানের প্রথম দিন থেকেই ১০ টাকা কেজি দরে দুধ বিক্রি হচ্ছে। এ দুধ নিতে প্রতিদিন সকালে খামারটিতে ভিড় করছে শত শত মানুষ।

রোজার মাসে এদেশের ব্যবসায়ীরা যখন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা করে, সেখানে বিপরীত উদাহরণ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান খামারের মালিক মো: এরশাদ উদ্দিন।

করিমগঞ্জের নিয়ামতপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যে কেউ রোজার মাসে এই খামার থেকে ১০ টাকা লিটারে দুধ কিনতে পারবেন। তবে শর্ত হলো, একজন ক্রেতা একদিনে সর্বোচ্চ এক লিটার দুধ কিনতে পারবেন। এলাকার সবাই যেন দুধ পায় এর জন্যই এই নিয়ম করা হয়েছে। ধনী গরিব সবাই দুধ কিনতে পারবেন। তবে গরিবদের অগ্রাধিকার বেশি।

গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি রমজানে রোজাদারদের কথা চিন্তা করে খামার মালিক মো: এরশাদ উদ্দিন এভাবেই দুধ বিক্রি করে আসছেন।

যা এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

এরশাদ উদ্দিন ওমরা করার জন্য বর্তমানে অবস্থান করছেন সৌদি আরবে। ফোনে কথা হয় তার সাথে।

তিনি বলেন, ‌‘আমি ক্ষুদ্র মানুষ, আমার ক্ষমতাও ক্ষুদ্র। অন্য বছরের মতো এবারও রমজানের ৩০ দিনে দুই থেকে আড়াই মেট্রিক টন দুধ ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করব। রোজার প্রথম দিন থেকেই এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার এই উদ্যোগ বাহাবা নেয়ার জন্য নয়। আমার উদ্দেশ্য হলো সামান্য কিছুও যদি এই রোজায় আমি মানুষের জন্য করতে পারি, মানুষ উপকার পাবে। আমরা যেন রোজার মাসে নিত্যপণ্যের দাম না বাড়াই। মধ্যপ্রাচ্যসহ ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কয়েকটি দেশেও রোজার মাসে মুসলিমদের জন্য নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয়। অথচ আমাদের দেশে এর বিপরীত ঘটে। আমরা প্রত্যেকেই যেন সবার জায়গা থেকে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করি। তাহলে আমাদের দেশকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।’

এরশাদ উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের রৌহা গ্রামে। ছয় বছর আগে এই গ্রামে জেসি অ্যাগ্রো ফার্ম নামের খামারটি গড়ে তুলেন তিনি। খামারে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। একইসাথে উন্নতজাতের ৩০টির মতো গাভিও পালন করা হচ্ছে। গাভিগুলো প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫ লিটার দুধ দিচ্ছে। সম্পূর্ণ দুধই রোজার মাসে তিনি ১০ টাকা লিটারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

কম দামে দুধ বিক্রি করায় লোকসান গুনতে হচ্ছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে এরশাদ উদ্দিন জানান, ‘লোকসান হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‌‘শুধু জেসি অ্যাগ্রো ফার্ম নয়, আমার আরো কয়েকটি ব্যবসা আছে। সব ব্যবসা মিলেই আমার লাভ-লোকসানের হিসাব। অন্য চার ব্যবসায় আমার লাভ হচ্ছে। খামারে না হয় একমাস দুধের দাম কমিয়ে দিলাম, সব ব্যবসার গড় টানলে দেখা যাচ্ছে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তাই রোজা খাবারের দাম কমিয়ে দিলাম।’

এরশাদ বলেন, ‘দুধ একটি খাদ্যপণ্য। রোজায় খাবারের দাম কমিয়ে দেয়া ব্যবসায়ী হিসেবে আমার নৈতিক দায়িত্ব। মধ্যপ্রাচ্য এমনকি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কয়েকটি দেশেও যেখানে রোজার সময় মুসলমানদের জন্য খাবারের দাম কমিয়ে দেয়া হয়, সেখানে আমাদের তো বাড়িয়ে দেয়া উচিত নয়। অথচ আমাদের দেশে এমনটাই ঘটছে। আমি চাই আমার দেশ থেকে এই কু-চর্চার অবসান হোক।’

এরশাদ উদ্দিনের উদ্যোগটি সারা দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।