মো: রেজোয়ান ইসলাম, ডিমলা (নীলফামারী)

নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় শাহীওয়াল জাতের দু’টি গরু প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সরিয়ে নিয়ে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলেও কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, স্থানীয় গ্রাম পুলিশের দাবি অনুযায়ী বিষয়টি বিট পুলিশ ও থানাকে জানানো হলেও ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার বলছেন, তিনি কিছুই জানেন না এবং এ ঘটনায় কেউ লিখিত অভিযোগও করেনি। প্রশাসনের দুই পক্ষের এই পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ঘটনাটিকে আরো রহস্যময় করে তুলেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গত ১৯ জুলাই তিস্তা নদীতে ভেসে আসে ভারতীয় শাহীওয়াল জাতের তিনটি গরু। এর মধ্যে একটি গরু মৃত ছিল। ডিমলা উপজেলার ছোটখাতা এলাকার বাসিন্দা মিন্টু ইসলাম নদী থেকে গরুগুলো উদ্ধার করেন। মৃত গরুটিকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হলেও জীবিত দুইটি গরুকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরিচর্যা করেন। নদীর পানিতে জমে থাকা পলি ও কাদা পরিষ্কার করে গরু দুইটিকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করেন তিনি।

ভারতীয় উন্নত জাতের গরু উদ্ধারের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষ গরু দেখতে মিন্টুর বাড়িতে ভিড় করেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনাটি ভিন্ন মোড় নেয়।

অভিযোগ উঠেছে, ভারতীয় চোরাকারবারী চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় জাফর খাঁন এবং গয়াবাড়ী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে গরু দুইটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে কলোনি এলাকার সবুজ নামের এক ব্যক্তিকে মালিক দাবি করে গরু দুইটি মিন্টুর বাড়ি থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।

মিন্টুর স্ত্রীর সাবিনা বানুর মতে, ‘আমার স্বামী নদী থেকে গরু উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে। জাফর, ফারুকসহ কয়েকজন এসে কলোনির লোকদের মালিক দেখিয়ে গরু নিয়ে যায়। পরে শুনেছি একটি ৬৫ হাজার ও অন্যটি ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা লেবু মিয়া (৪৫) নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘১৯ জুলাই সকালে মিন্টু তিনটি গরু উদ্ধার করে। পরদিন বিকেলে জাফর খাঁন ও ফারুক হোসেন কয়েকজনকে সাথে নিয়ে আসে। তারা সবুজকে মালিক দেখিয়ে গরু দুইটি নিয়ে যায়।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মিন্টুর প্রতিবেশী শাহীন আহমেদ (২৮) বলেন, ‘গরু নিয়ে যাওয়ার সময় একজন ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। তখন ফারুক তার মোবাইল ফোন নিয়ে ভিডিও ডিলিট করে দেয়। ভিডিও করলে সমস্যা কোথায় এমন প্রতিবাদ করলে ফারুকের সাথে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।’

অভিযোগ রয়েছে, পরে গরু দুইটি স্থানীয়ভাবে বিক্রি করা হয়। গরু ক্রয়ের অভিযোগে নাম আসা লুৎফর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘হক টাকা দিয়ে গরু কিনে থাকলে আপনাদের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?’ এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে লুৎফর রহমানের ভাই নুর আলম জানান, ‘রাতে সবুজ ভাই একদিনের জন্য আমার বাড়িতে গরু রেখেছিলেন। পরদিন সকালে গরু নিয়ে যান। আমি গরু কিনিনি। মিন্টুর বাড়ি থেকে গরু নিয়ে যাওয়ার নেতৃত্বে জাফর খাঁন ও ফারুক হোসেন ছিলেন। সবুজ ভাই আমার পূর্ব পরিচিত।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ফারুক হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহীন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির সাথে তার বিরোধ রয়েছে। তাই ওই এলাকায় সে যেতে পারবে না। গরু ক্রয় বিক্রয়ের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

অন্যদিকে জাফর খাঁনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব গরু ব্যক্তি মালিকানার। এসব নিয়ে আপনার কী?‘ পরে তিনি প্রতিবেদকের সাথে অশোভন ভাষায় কথা বলেন।

খালিশাচাপানি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ সুভাষ চন্দ্র রায় নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘নদী থেকে গরু উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে গরু দুইটা দেখি। বিষয়টি সাথে সাথে চেয়ারম্যানকে ফোন করে জানাই। চেয়ারম্যান আমাকে পরামর্শ দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিট অফিসার এসআই এনামুল স্যারকে জানাতে। পরে আমি এসআই এনামুল স্যারকে বিষয়টি জানাই। তিনি বলেন, ওসি স্যারের সাথে কথা বলবেন। পরে ওসি স্যার তাকে কী বলেছেন তা আমি জানি না। তবে আমরা উপস্থিত কয়েকজন গরুগুলোকে কয়েকদিন সংরক্ষণ করে রাখতে বলেছিলাম, যাতে প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা যায় অথবা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। পরে ২০ জুলাই বিকেলে আবার সেখানে গিয়ে জানতে পারি, জাফরসহ কয়েকজন ব্যক্তি গরু দুইটা নিয়ে গেছে। এখন বিষয়টি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।’

গ্রাম পুলিশের এই বক্তব্যের পর প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত বিট অফিসার এসআই এনামুল হক বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তবে ক্লিয়ারলি কিছু জানি না।’

আর ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কেউ লিখিত অভিযোগও দেয়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অন্যদিকে রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: নাজিউর রহমান বলেন, ‘তথ্য পাওয়ার পর আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। পরে জানতে পারি ঘটনাস্থল আমাদের দায়িত্বাধীন এলাকার মধ্যে পড়ে না।’