ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয়দের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আদিবাসী শব্দের ব্যবহারকারীদের আইনের আওতায় আনার দাবিতে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি)।

মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) স্মারকলিপি রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবরে প্রদান করা হয়।

এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ পিসিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো: আলমগীর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান, যুগ্ম-সম্পাদক মহিউদ্দিন নুহাশ, প্রচার সম্পাদক ইসমাঈল গাজী, দফতর সম্পাদক রিয়াজুল ইসলাম বাবু, অর্থ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক সাজেদা বেগম, সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস বিথীসহ পৌর ও কলেজ শাখার পিসিসিপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

স্মারকলিপিতে পিসিসিপির রাঙ্গামাটি জেলা শাখার নেতারা উল্লেখ করেন, আদিবাসী স্বীকৃতির দাবির আড়ালে দেশ ভাগের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা রাষ্ট্র তথাকথিত ‘জুমল্যান্ড’ বানানোর জন্যই ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী তথা উপজাতিদের পাশাপাশি দেশীয় ষড়যন্ত্রকারী কতিপয় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি তুলে তা ব্যবহার করেই যাচ্ছে।

মূলত কাক যেমন ময়ূরের পেখম লাগালে ময়ূর হয় না, তেমনি এদেশের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বা উপজাতিরা কখনো ‘আদিবাসী’ নয়। এদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) ১১টি ক্ষুদ্র উপজাতি (যেমন-চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খুমি, বম, তঞ্চংগা, লুসাই, চাক, পাংখোয়া, খেয়াং ও ম্রো) বাস করে। এছাড়া সাঁওতাল, গারো, হাজং উপজাতি নেত্রকোনায়, গারো পাহাড়, ময়মনসিংহে, রাজশাহীর কিছু অঞ্চলে, সিলেটের জাফলং এ বসবাসরত খাসিয়া উপজাতি, মনিপুরীরা কমলগঞ্জ, লাউয়াছড়া, মৌলভীবাজারে এবং রাখাইনরা রামু, কক্সবাজার অঞ্চলে বসবাসরত রয়েছে। এসব উপজাতিরা আদিবাসী কিনা? এবং এদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে সমস্যা কোথায়? তা জানতে বিশদভাবে আদিবাসী ইস্যুটি আলোচনায় আনতে হবে- পার্বত্য চট্টগ্রামে ও দেশের অন্য অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাসের ইতিহাস ৩০০ বছরের নিচে। জাতিসংঘ প্রণীত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ (আইএলও) কনভেনশনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ‘সংজ্ঞা’ মতে আদিবাসী হতে হলে নির্দিষ্ট স্থানে কয়েক হাজার বছর বসবাস করতে হবে, যাদের বসতি স্থাপনের বা যথাস্থানে বসবাসের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস বিদ্যমান এবং তাদের কথ্য ও লেখ্য ভাষা ভাণ্ডারে থাকতে হবে কমপক্ষে দেড় হাজার শব্দভাণ্ডার। বর্ণিত বিষয়গুলো থাকলেই জাতিসংঘের (আইএলও) কনভেনশন এর সংজ্ঞা মতে আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বীকৃত হবে না। তাদের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, জীবনযাত্রা, চালচলন ও খাদ্যাভ্যাস প্রভৃতি কিছুটা সংশ্লিষ্টদের থেকে আলাদা বিদ্যমান থাকতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি মানুষদের সঙ্গে আদিবাসী শব্দচয়ন বা জনগোষ্ঠীর বা সমমানের কোনো বিন্দুমাত্র মিল নেই। সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হলো, বাংলাদেশ বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি মানুষের বসবাস মাত্র ৩০০ বছর। এরা পাশের বার্মা, ভারতের তিব্বত, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মঙ্গোলীয় এবং চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ১৭৩০ সাল নাগাদ যুদ্ধে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অস্থায়ীভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় গ্রহণ করে। অনেক চাকমা ও মারমা পণ্ডিত, লেখকরাও অনায়াসে তাদের লেখা বিভিন্ন বইতে উল্লেখ করেছে, ‘তারা আদিবাসী না, তারা পাশের দেশগুলো থেকে এদেশে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের অধিকাংশের আদি নিবাস বার্মা ও বার্মার চম্পকনগর।’ তারা যে এদেশের আদি বাসিন্দা নয়, এটা তারা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও অকপটে স্বীকার করেছে। (সূত্র : কার্পাস মহল থেকে শান্তি চুক্তি-আনন্দ বিকাশ চাকমা, বমাং রাজার সংলাপ)

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন পার্বত্য চুক্তিতে উপজাতিরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি না করে বরঞ্চ নিজেদের উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করে চুক্তি স্বাক্ষরিত করেছিল। ভাববার বিষয় হলো, চুক্তির এত বছর পরে তারা আবার এখন নিজেদেরকে ‘আদিবাসী’ দাবি করে কেন? এটা কিন্তু বাঙালি জাতিসত্তা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাস। পার্বত্য চুক্তির সম্পাদিত হওয়ার ফলে উপজাতি কোটায় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, উপজাতি কোটায় শিক্ষা-দীক্ষা-চাকরি ও অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পরে এখন তারা দাবি জানাচ্ছে নিজেরা ‘আদিবাসী’।

আদিবাসী নিয়ে যারা বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছেন, তারা হচ্ছে উপজাতিদের অধিকারের নামে বিভিন্ন বিদেশী সংস্থা, আইএনজিও, এনজিও, উপজাতি নেতাদের ভিতর রাঙ্গামাটি চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায় ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়ান ইয়ান, গৌতম দেওয়ান, প্রকৃত রঞ্জন চাকমা সহ দেশের তথাকথিত কতিপয় দেশদ্রোহী চিহ্নিত কিছু সুশীল সমাজ, বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং কতিপয় হলুদ সাংবাদিকরা। অধিকারের দোহাই দিয়ে চাঁদাবাজি ও মানুষ হত্যা করা সন্ত্রাসী বাহিনী ও কিছু বিদেশী দাতাসংস্থাসহ এদেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে সরগরম করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম সক্রিয় হচ্ছে সুশীল, কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল রাম-বামরা। বৈদেশিক দাতাসংস্থা ইউএনডিপি অর্থায়নে কতিপয় আদিবাসী শব্দের প্রচলন ও স্বীকৃতি দাবি এদেশে উপজাতিদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সমতলের ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে বসবাসরত সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী এবং রাখাইনসহ কয়েকটি তফশিল সম্প্রদায়ও নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছেন তাদের সাথে সুর মিলিয়ে। তাদের এদেশের বসবাসের ইতিহাসও ৩০০ বছরের বেশি নয়। এতে করে এই সমস্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলো তাদের মিশন ভিশন ও কর্মক্ষেত্রের নতুন জায়গা খুঁজে পাবে। নির্বিঘ্নে এই সমস্ত কোমলমতি ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বীয় স্বার্থ হাসিলের কাজে ব্যবহার করতে পারবে।

এখানে ‘আদিবাসী’ শব্দটির একটি ভুল ব্যাখ্যা বেশি কাজ করছে। এই ভুল ব্যাখ্যা কাজ করার পেছনে লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র ভাগ করার ভয়ংকর পরিকল্পনা, বিশেষ করে যারা পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে ‘উপজাতি খাটো ও অপমান জনক শব্দ বলে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ‘আদিবাসী’ পরিচয় বহন ও স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আন্দোলন সৃষ্টি করে দিয়েছে’ তাদের অবস্থান বরাবরই সারাবিশ্বে প্রশ্ন বিদ্ধ। এদের শেখানো ফন্দি আঁটেন স্বদেশীয় মীরজাফররা। এ অবস্থায় উপজাতিরা মনে করে, আদিবাসী জাতি হিসেবে তাদের পরিচয় বহন করা গর্বের আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উপজাতি হিসেবে পরিচয় বহন করা অপমানজনকও লজ্জাকর! তাই তারা আর উপজাতি পরিচয়ে থাকতে চান না! বিষয়টি যেমন হাস্যকর তেমনি উদ্বেগজনক। এটা রাষ্ট্র ভাগ করার ষড়যন্ত্রও বটে। এমন ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে এসব ষড়যন্ত্রকারী জনগোষ্ঠীর কিছু চক্রান্তকারী ব্যক্তিরা।

দেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রবিরোধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শব্দ ‘আদিবাসী’ শব্দ বললে ও লিখলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা শাখা।

এছাড়া ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে পঞ্চম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন শেষে ফেরার পথে উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ও আহতদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা ও সশস্ত্র খুনি উপজাতি সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবি জানান পিসিসিপি রাঙ্গামাটি জেলা শাখার নেতারা।