মিয়ানমারে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করছেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। তবে তাদের প্রত্যাবাসনের বেশ কিছু শর্তের কথা বলেছে তারা। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং বিচারহীনতার অবসান চায়।
রোহিঙ্গারা বলেছেন, ‘তারা এমন এক দেশের নাগরিক ছিলেন, যেখানে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র চলেছে বছরের পর বছর। আমার মা-বাবাকে গুলি করে মেরেছে মিয়ানমারের সেনারা। তাদের বক্তব্য, বাড়িঘর, জমিজমা, সহায়-সম্পদ সবই দখল করেছে স্থানীয় বৌদ্ধরা ও সেনাবাহিনী।’
বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গা যুবক হৃদয়বিদারক বর্ণনায় বলেন, ‘আমার স্ত্রীর ওপরও নির্যাতন হয়েছে। ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ করেছে মগ বাহিনী। আমরা কীভাবে তাদের কাছে ফিরে যাব?’
২০১৭ সালে কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং মধুরছড়া ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা নারী মরিয়ম বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে তারা কি ফিরছেন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে, নাকি অপেক্ষাকৃত নতুন প্রতিপক্ষ আরাকান আর্মির অধীনে?’ ফেরত পাঠানোর আগে মিয়ানমার সরকারকে আমাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা যাতে চিকিৎসা, শিক্ষা, চলাফেরা সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পাই, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বলছে, রোহিঙ্গাদের ‘নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন’ নিশ্চিত করতে হবে। আর তা হতে হবে স্বেচ্ছামূলকভাবে। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কূটনৈতিকভাবে কাজ করছে। তবে ভুক্তভোগীদের অভিমত, প্রত্যাবাসনের আগে যদি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ না থাকে, যদি নিরাপত্তা না থাকে, যদি বিচার না হয় তাহলে ফেরার অর্থ হবে আবারো নির্যাতনের মুখে ফেলা।
স্থানীয়রা বলছেন, ‘রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান শুধু মানবিক নয়, এটি এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সঙ্কটও বটে। এর সুরাহা হতে পারে একমাত্র আন্তর্জাতিক চাপ, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমঝোতা এবং মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছা।’
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে বসে ৪৫ বছরের রোহিঙ্গা নারী হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার চোখের সামনে ওরা আমার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। মেয়েটাকে নিয়ে গেছে সেনারা। তখনো বুঝিনি, কী ভয়াবহ দিন আসছে সামনে। তিনি সেই হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকের একজন, যারা ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর চালানো ‘জাতিগত নির্মূল অভিযানে’ প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন বাংলাদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মহল ও আঞ্চলিক রাজনীতির চাপে মিয়ানমার সরকারের সাথে আবারো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।’
বাংলাদেশ সরকারও চায়, দ্রুততম সময়ে এই সঙ্কটের টেকসই সমাধান হোক। তবে ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের ভয় এখনো কাটেনি। ৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘আমরা ফিরে যেতে চাই, নিজের দেশে মরতে চাই, পরের দেশে নয়। কিন্তু কোন দেশে ফিরবো? যেই দেশে আমাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে? নাকি যে দেশে আমরা মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাইনি কোনোদিন?
তিনি জানান, ‘২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ভোরে যখন তাদের গ্রামে সেনাবাহিনী ঢোকে, তখন শুধু গুলি আর আগুন চলছিল চারদিকে। বোনকে ধরে নিয়ে গেল। আমি কিছু করতে পারিনি। এখনো রাতে ঘুমালে তার কান্না শুনি, কণ্ঠ কেঁপে ওঠে তার।
৫০ বছর বয়সী আজিজুল হক বলেন, ‘তাদের বাড়িঘর, জমিজমা সবই দখল করে নিয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধরা ও সামরিক বাহিনীর লোকজন। যারা ফিরে যেতে চান, তারা জানেন না, ফিরলে কোথায় মাথা গুঁজবেন। আমাদের জায়গায় এখন সেনা ক্যাম্প, মন্দির বা অন্য লোকজনের বসতি গড়ে উঠেছে। আমরা কোথায় থাকবো? নিজের গ্রামে গিয়ে যদি আবার পায়ে বেড়ি পড়ে, তাহলে ফেরার মানে কী?’
আরেক রোহিঙ্গা তরুণী সেতারা বেগম জানান, ‘আরেকটি বড় সমস্যা ‘নাগরিকত্ব।’ বহু বছর ধরেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ‘অবৈধ বাঙালি’ বলে চিহ্নিত করা হয়। তারা ছিল পরিচয়হীন, নাগরিক অধিকারবঞ্চিত একটি গোষ্ঠী। আমরা চাই এনআইডি, জন্মসনদ, জমির কাগজ সবকিছু ফিরিয়ে দিক। যাতে আমরা সেখানে শিক্ষার সুযোগ পাই, হাসপাতালে যেতে পারি, ভোট দিতে পারি। আমরা ভিক্ষুক হয়ে ফিরতে চাই না।’
প্রশ্ন তুলে রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ওসমান বলেন, ‘সেনাবাহিনী না আরাকান আর্মি, কার হাতে পড়বে তারা? রোহিঙ্গাদের আরেকটি উদ্বেগ, ফিরে গেলে তারা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবেন? সেনাবাহিনীর, নাকি আরাকান আর্মির? রাখাইনে বর্তমানে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়েছে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকার। উভয় পক্ষের মধ্যেই রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। ফেরত পাঠানোর আগে স্পষ্ট করতে হবে, আমরা কার কাছে যাচ্ছি? যারা একদিন আমাদের গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা কি আজ বন্ধু হয়ে গেছে?’
মানবিকতা বনাম বোঝা বাংলাদেশ ১৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। কিন্তু এখন এই জনগোষ্ঠী হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত এক বড় বোঝা। প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান, বারবার বলে আসছে বাংলাদেশ। তবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন না হলে, তা হবে ‘নতুন একটি ট্র্যাজেডির’ সূচনা এমন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী।
আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ : জাতিসঙ্ঘ, এএইচআরসি, ইউএনএইচসিআরসহ অনেক সংস্থাই বলছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ এবং মানবিক। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেসব কথার বাস্তব প্রতিফলন নেই। জবাবদিহিতা না হলে, বিচার না হলে, রোহিঙ্গারা কখনোই নিরাপদে বাঁচবে না। আরেকবার গণহত্যা ঠেকাতে হলে বিশ্বের এখনই জেগে ওঠা দরকার মন্তব্য করেন মানবাধিকার কর্মী হুমায়রা আক্তার।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা শুধু শরণার্থী নয়, তারা ইতিহাসের এক চলমান বেদনার নাম। তারা স্বপ্ন দেখে নিজের দেশে ফেরার, কিন্তু সেই ফেরার পথ যেন রক্তাক্ত না হয়, অবমাননাকর না হয়, সেই নিশ্চয়তা চায় তারা। ফিরে যেতে চায়, কিন্তু ‘মানুষ’ হয়ে।