আজ ২৬ জুন, ঐতিহাসিক দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা মুক্ত দিবস। ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ ও বন্দিজীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯২ সালের এই দিনে উন্মুক্ত হয়েছিল ঐতিহাসিক ‘তিনবিঘা করিডোর’।

ভারতের অভ্যন্তরে থেকেও বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে অবাধ যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছিল এই দিনে। সেই থেকে প্রতিবছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী এ দিনটিকে ‘মুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।

জানা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভৌগোলিক কারণে ২২.৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অংশ হলেও এটি চারিদিক থেকে ভারতের ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত ছিল। ফলে দীর্ঘ চার দশক এই অঞ্চলের মানুষকে চরম অবহেলা, বঞ্চনা আর অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনেও তারা মূল ভূখণ্ডে আসতে পারতেন না।

পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আলোকে পঞ্চগড়ের বেরুবাড়ী ছিটমহলের বিনিময়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর যাতায়াতের জন্য দৈর্ঘ্য ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থ ৮৫ মিটার আয়তনের ‘তিনবিঘা জমি’ বাংলাদেশকে লিজ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, ১৯৯২ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের সদিচ্ছায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ‘তিনবিঘা করিডোর’।

১৯৯২ সালের ২৬ জুন মাসে শুরুতে রেশনিং পদ্ধতিতে দিনে মাত্র ৬ ঘণ্টা (এক ঘণ্টা পর পর) করিডোর খোলা রাখা হতো। এতেই প্রথম মুক্তির স্বাদ পান তৎকালীন প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা।

২০০১ সালের ২১ এপ্রিল করিডোর খোলা রাখার সময় আরো ছয় ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত (১২ ঘণ্টা) করা হয়।

২০১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বরে ঐতিহাসিক এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

করিডোর সার্বক্ষণিক উন্মুক্ত হওয়ার পর অবহেলিত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় দ্রুত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও প্রশাসনিক ভবন। যুক্ত হয়েছে আধুনিক মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা।

দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে এই জনপদে প্রায় ৪ হাজার পরিবারে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করছেন। এক সময়ের অনগ্রসর এই অঞ্চলে বর্তমান শিক্ষার হার প্রায় ৮০ শতাংশ।

তৎকালীন দহগ্রাম ছিটমহল বিনিময় সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম খালেদা জিয়ার আমলেই দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী প্রথম মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল। তার অবদানের কথা এ অঞ্চলের মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।’

উন্নয়নের জোয়ার বইলেও বর্তমানে নতুন এক সংকটে পড়েছেন এই ঐতিহাসিক জনপদের বাসিন্দারা। তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে প্রতিবছরই ছোট হয়ে আসছে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানচিত্র। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয়রা জানান, এই ঐতিহাসিক ভূখণ্ডকে টিকিয়ে রাখতে হলে তিস্তার ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

এ বিষয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান জানান, ‘সরকার পিছিয়ে পড়া এই জনপদটির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। নদীভাঙন রোধসহ এলাকার অবকাঠামোগত কী কী ঘাটতি রয়েছে, তা নিরূপণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’