২০১৭ সালের ভয়াবহ গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গার আগমনের আট বছর পর আবারো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সৃষ্ট নতুন সহিংসতায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ বেড়েছে। আরাকান আর্মির নিপীড়ন, দখলদারিত্ব ও দমন-পীড়নের কারণে রাখাইন রাজ্যের সাধারণ রোহিঙ্গারা এবার পাহাড়ি দুর্গম সীমান্তপথ বেছে নিয়ে দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ফলে সীমান্তজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে রোহিঙ্গারা সংঘবদ্ধ পাচারকারীদের সহায়তায় কঠিন ও নজরদারি-বহির্ভূত পথ ব্যবহার করায় অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। সীমান্তের দুই পাশের দালাল চক্র এ অনুপ্রবেশকে আরো জটিল করে তুলেছে।
এদিকে রোহিঙ্গা নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, রাখাইনের পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে রাজ্যটির ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’। এ বাহিনী কথিত আরসা সদস্যদের নামে রোহিঙ্গা গ্রামে অভিযান চালিয়ে গুম, লুটপাট, ঘরবাড়ি পোড়ানো ও গণচাঁদা আদায়ের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মংডুর এক রোহিঙ্গা যুবক বলেন, ‘আরাকান আর্মির দমন-পীড়নে আমরা বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছি। তারা আমাদের আরসার সহযোগী আখ্যা দিয়ে ধরে নিয়ে যায়, নিপীড়ন চালায় ও সর্বস্ব লুট করে।’
সম্প্রতি মংডুর সিকদারপাড়া গ্রামে চালানো অভিযানে ১০ জনকে আটক, পাঁচটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া এবং পুরো গ্রামবাসীকে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
এদিকে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের ভেতর থেকেও আগুন ও ধোঁয়া দেখা গেছে বলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাঁট থেকে স্থানীয়রা জানায়।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান জানান, মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে আসা এক লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। তবে অনেকেই এখনো নিবন্ধনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তিনি আরো জানান, অপেক্ষমানদের খাদ্য সহায়তা টোকেন দেয়া হয়েছে। তবে টোকেনধারীদের মধ্যে পুরনো রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাংলাদেশীদের উপস্থিতি থাকায় নির্ভুল সংখ্যা নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে নতুন আসা রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছেন। সেখানে আগে থেকেই বসবাস করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। যাদের অধিকাংশই ২০১৭ সালের সেনাবাহিনীর ‘নির্মূল অভিযান’-এর সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো: জুবায়ের বলেন, ‘আরাকান আর্মি পরিকল্পিতভাবে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। বর্তমানে রাখাইনে থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গার অনেকেই পালিয়ে আসতে চাচ্ছেন। তবে চাঁদা না দিলে তাদের চলাফেরা, ব্যবসা বা গ্রাম থেকে বের হওয়াও নিষেধ।’
বিজিবির টেকনাফ ব্যাটালিয়ন-২ এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকায় টহল জোরদার থাকায় রোহিঙ্গারা এখন পাহাড়ি দুর্গম পথ ব্যবহার করছে। পাচারকারীরাও তাদের রুট ও কৌশল পরিবর্তন করছে। তাই আমাদেরও প্রতিনিয়ত কৌশল হালনাগাদ করতে হচ্ছে।’
জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতে, রাখাইন রাজ্যে সংঘর্ষ এবং রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা উদ্বেগজনক। তবুও প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই। ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদে আরো ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।