সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ হাছান চৌধুরীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ মে) রাত ৮টায় পুলিশ সদরদফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর নয়া দিগন্তকে এ তথ্য জানান।
মামলার আসামি হয়েও আব্দুল হামিদ দেশ ছাড়লেন কিভাবে তা নিয় দেশে তুমুল আলোচনা শুরু হলে সরকার এই ব্যবস্থা নেয়।
তবে একটি সূত্র বলছে, আব্দুল হামিদ দেশ ছেড়েছেন এটা গোপন কোনো বিষয় ছিল না। বিমানবন্দরে সব গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং ইমিগ্রেশনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই দেশ ছাড়েন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। শুধু নিজে নয়, সাথে নিয়ে গেছেন ছেলে ও শ্যালককেও। ঢাকা ত্যাগের সময় সাবেক এ রাষ্ট্রপতি ভিআইপি টার্মিনাল ব্যবহার করেন এবং বিমানবন্দরের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে তিনি প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করেন। সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের সম্মতি ছাড়া তিনি দেশত্যাগ করেননি। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এরপরেও সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এছাড়া এ ঘটনায় আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের সদর থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এটিএসআই মো: সোলায়মানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি এনামুল হক সাগর জানান, আব্দুল হামিদের দেশ ত্যাগের ঘটনায় অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) মতিউর রহমান শেখকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর আগে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যসহ তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দফতর।
এদিকে, কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ জনুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। মামলার কাগজপত্র ও সকল তথ্যাদি পরের দিনই অর্থাৎ ১৫ জানুয়ারি ইমিগ্রেশনসহ সরকারের সকল দফতরে পাঠানো হয়।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) ইনামুল হক সাগর জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এদিকে আব্দুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার, ডিএসবি কর্মকর্তা ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘটনায় কিশোরগঞ্জে সচেতন মহলসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা এ ঘটনাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’ মনে করছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেককেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে গণআধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেন, ‘...জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি দেশত্যাগ করেছেন। সেখানে প্রধান উপদেষ্টার গ্রীণ সিগন্যাল ছিল এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সহযোগিতায় তিনি ইমিগ্রেশন পার হয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি দেশত্যাগের বিষয়ে উপর মহলের নির্দেশ না থাকলে কখনো ইমিগ্রেশন পার হতে পারতো না। এখন নিরীহ কয়েকজন কর্মকতা প্রত্যাহার করে মূলত শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে সরকার।’
তিনি আরো লিখেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির দেশত্যাগের বিষয়ে একটা জেলার পুলিশ সুপার, একটা থানার এসআই কিংবা একজন এসবির সদস্য কতটা ভূমিকা পালন করতে পারে এটা একজন সচেতন মানুষ হলেই অনুধাবন করা যায়। অথচ আজকে রাঘববোয়ালদের রক্ষা করতে গিয়ে নিরীহ কর্মকর্তাদের শাস্তি দিয়ে মূলত জনরোষে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে সরকার। এগুলো অন্যায়...‘
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিশোরগঞ্জের অন্যতম সমন্বয়ক অভি চৌধুরী ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ দেশ ত্যাগ করেছে! গত সাত থেকে নয় মাস তার অবস্থান কোথায় ছিল? তার দেশত্যাগে কেন কিশোরগঞ্জের এসপিকে প্রত্যাহার করা হবে? আব্দুল হামিদকে দেশত্যাগের সাথে কিশোরগঞ্জের এসপির সম্পৃক্ততা কী? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী তাহলে হাসিনার ফর্মূলাতেই পরিচালিত হচ্ছে?‘
কিশোরগঞ্জ জেলার ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পায়েল চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ‘আমরা মনে করি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে বাঁচানোর জন্যই কিশোরগঞ্জের এসপিকে প্রত্যাহার করেছে। হাসিনার সিস্টেমই রয়ে গেল।’
এদিকে সরকারের নির্লিপ্ততায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মো: আবদুল হামিদ দেশত্যাগ করায় তার নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
গেল বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলা সদরে এ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। রাত পৌনে ৮টার দিকে মিঠামইন সদরের উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের করা হয়।
সমাবেশে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর তার বক্তব্যে বলেন, ‘মামলা থাকার পরও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিনা বাধায় দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ঘটানো হয়েছে। এখন সাধারণ পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এটা সরকারের নাটক। হামিদের দেশত্যাগের ঘটনায় জড়িত প্রকৃতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাসহ সরকারের সবাইকে এর জন্য জবাব দিতে হবে।’
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের নয় মাস পর বুধবার (৭ মে) দিবাগত রাত ৩টা ৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দেশ ছাড়েন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, ‘আবদুল হামিদ শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। নিরাপত্তার অভাবের অজুহাতে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য গত বুধবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে যান আবদুল হামিদ। পরে ইমিগ্রেশনের প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে দেশ ছাড়ার সবুজ সঙ্কেত দেয়া হয়।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইমিগ্রেশন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (৮ মে) সকালে কর্মস্থলে এসে আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তিনি বিদেশ যাওয়ার কারণ হিসেবে চিকিৎসার অজুহাত দেখিয়েছেন।’
উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জ সদর থানায় আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়। এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের আরো অনেকে আসামি হন।
কিন্তু তারপরও কেন আবদুল হামিদকে দেশ ত্যাগের অনুমতি দেয়া হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে ইমিগ্রেশন পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের মামলার বিষয়টি ইমিগ্রেশন বিভাগ অবগত ছিল। কিন্তু তার বিদেশ সফরের বিষয়ে আদালত বা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তাই তার বিদেশযাত্রায় বাধা দেয়া হয়নি। আর এমনিতেই আবদুল হামিদ শারীরিকভাবে অসুস্থ।’