ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্স সমৃদ্ধ জেলা ফেনী গত এক বছরে দু’বার ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বক্তারা। উপদেষ্টারা মুখে আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
২০২৪ সালের শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মৃতিচারণ ও স্থায়ী সমাধানে করণীয় বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তারা।
সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নাগরিক সংগঠন ‘ফেনী কমিউনিটি’ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সংগঠনের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আব্দুল্লাহ।
এছাড়া সদস্য সচিব বুরহান উদ্দিন ফয়সালের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোতাহের হোসেন, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী ফারাবী হাফিজ, জাতীয়তাবাদী সমবায় দলের সাধারণ সম্পাদক ড. নিজাম উদ্দিন, কানাডা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী, ব্যবসায়ী ও ফেনী ফোরামের সহ-সভাপতি দিদারুল আলম মজুমদার, সোনাগাজী ফোরাম ঢাকার সভাপতি ইব্রাহিম বাহারী, ব্যাংকার ও সমাজকর্মী ওমর ফারুক, ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম, সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল, সৌদি আরব বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমেদ প্রমুখ।
এ সময় আয়োজকদের পক্ষ থেকে দাবি আদায়ে একটি লিয়াজো কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘গত বছরের ফেনীর বন্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা বানভাসীদের দেখতে না যাওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছি। তিনি অন্তত হেলিকপ্টার নিয়ে ঘুরে আসতে পারতেন।’ এবারের বন্যায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা এলাকা পরিদর্শন করায় ধন্যবাদ জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি একনেকে ফেনীর বন্যা মোকাবিলায় একটি প্রকল্প পাস হয়েছে, যদিও বাজেট চাহিদার তুলনায় অর্ধেক। দুর্নীতিমুক্ত থাকলে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব। এজন্য জেলার সব মত-পথের মানুষদের একত্রিত হয়ে স্বেচ্ছার ভূমিকা রাখতে হবে।’
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ফেনীবাসী রাজনৈতিক ও প্রতিবেশী আগ্রাসনের শিকার। বর্তমান সরকার জনগণের সরকার হলেও ফেনীর সমস্যায় তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়নি। সম্প্রতি সাত হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, এটি যেন লুটপাটের কবলে না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে।’
সাংবাদিক ফারাবী হাফিজ ২০২৪ সালের বন্যায় নিজ হাতে তিনটি বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও পরিবার বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ফেনীবাসীর পাশে থাকার স্মৃতি তুলে ধরলে মিলনায়তন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে।
প্রকৌশলী মোতাহের হোসেন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রতিবেশী দেশ। তারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের ডুবিয়েছে। বিগত সরকারের সময় উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে, ফলে উন্নয়নগুলো টেকসই হয়নি। এবার অন্তত স্থায়ী সমাধান চাই।’
ফেনী কমিউনিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সাংবাদিক কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘বন্যার এক বছর পার হলেও কোনো টেকসই সমাধান হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে আমরা আশাবাদী ছিলাম, কিন্তু তাদের বানানো বাঁধ ছয় মাসও টিকলো না। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দেখালেও নদী, খাল বা জলাধার উদ্ধার হয়নি। কম খরচে বড় সমাধান সম্ভব ছিল, তারা সেদিকে নজর দেয়নি।’
ব্যবসায়ী দিদারুল আলম মজুমদার বলেন, ‘ফেনীর বন্যা ঝুঁকি শুধু ফেনীর সমস্যা নয়, এটি জাতীয় সমস্যা। এর সমাধানে রাজনৈতিক ঐক্য প্রয়োজন।’
কানাডা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী বলেন, ‘এক বছরে অনেক দাবি তোলা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। অসংখ্য মানুষ পুনর্বাসিত হয়নি, ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়েছেন। শুধু বাঁধ নয়, নদী-খাল-জলাধার উদ্ধার জরুরি। দাবি বাস্তবায়নে আরো শক্ত অবস্থানে যেতে হবে।’
জাতীয়তাবাদী সমবায় দলের সাধারণ সম্পাদক ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ফেনীর বন্যার বড় কারণ প্রতিবেশী ভারতের অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া পানি। বিগত সরকার ভারতের অন্যায়ে চুপ ছিল। আমরা ভেবেছিলাম ছাত্রজনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আসা সরকার অন্তত দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। কিন্তু এখনো বিবাদপূর্ণ বাঁধের কোনো সমাধান হয়নি, আগাম পানির তথ্যও আদায় করতে পারেনি।’