তীব্র, অসহনীয় ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে গোটা ফ্রান্স। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ফরাসি জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রঁস জানিয়েছে, বর্তমানে অন্তত ৬০টি বিভাগে কমলা সতর্কতা জারি রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে এবং কিছু অঞ্চলে তা ৪১ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
গত ১৭ জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী অঞ্চল ইল-দ্য-ফ্রঁস, দক্ষিণাঞ্চলের জিরঁদ, এরো, বুশ-দ্যু-রন ও রোন অঞ্চলে গরমের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। দিনের প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও ২০ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামছে না। ফলে মানুষ পর্যাপ্ত স্বস্তি পাচ্ছেন না। বিশেষ করে বড় শহরগুলোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপ-দ্বীপ প্রভাবের কারণে গরম আরো বেশি অনুভূত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
গত শুক্রবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দেন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও নাগরিকদের সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরের পর থেকে তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী প্যারিসের সড়ক, আবাসিক এলাকা ও মেট্রো স্টেশনগুলোতে ভয়াবহ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে রেললাইনের ধাতব অংশে প্রসারণজনিত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের বেশ কয়েকটি রুটে ট্রেন ও মেট্রোর গতিসীমা কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিলম্বের শিকার হতে হচ্ছে। একইসাথে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ও কুলিং সিস্টেমের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত তীব্র গরমে প্যারিস ও এর আশপাশে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশীও দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহন এবং অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর পেশায় নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষদের কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে সকাল ও সন্ধ্যায় কাজ করার চেষ্টা করছেন।
প্যারিসের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘সকালে কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরের পর কাজ করা খুবই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড রোদে কয়েক ঘণ্টা কাজ করার পর মাথা ঘোরার মতো অবস্থা হয়। বাধ্য হয়ে বারবার বিরতি নিতে হচ্ছে এবং বেশি করে পানি পান করতে হচ্ছে।’
ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলে ভিটিসি (উবার) চালক হিসেবে কর্মরত আব্দুল করিম বলেন, ‘গরমের কারণে যাত্রীদের পাশাপাশি চালকরাও ভোগান্তিতে আছেন। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর সময় এসি চালিয়ে রাখতে হচ্ছে, ফলে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। দুপুরের দিকে রাস্তায় বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।’
প্যারিসের উপকণ্ঠে বসবাসকারী শিক্ষক ও দুই সন্তানের জননী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় আছি। স্কুলে উপস্থিতি ঐচ্ছিক করায় অনেক অভিভাবকের মতো আমরাও সন্তানদের বাসায় রাখছি। ঘরের ভেতরেও গরম সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতি আগে খুব কমই দেখিনি।’
এদিকে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় প্যারিসের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ঐচ্ছিক করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কোথাও কোথাও ক্লাসের সময় পরিবর্তন বা সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে রোববার ফ্রান্সজুড়ে পালিত ঐতিহ্যবাহী ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ বা বিশ্ব সংগীত দিবসের বিভিন্ন আয়োজনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভয়াবহ আবহাওয়ার কারণে বেশ কিছু অনুষ্ঠানের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ এবং কিছু আয়োজন অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এদিকে দাবদাহের কারণে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউরোপজুড়ে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ আবহাওয়ার ঘটনাগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে আরো স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসছে।
তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু সঙ্কট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।