ফ্রান্সে বৈধ আবাসন কাগজপত্রবিহীন বিদেশীদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব আবারো আঁসাম্বলে নাসিওনাল বা জাতীয় পরিষদে আলোচনায় এসেছে। ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ইউডিআর-এর উদ্যোগে উত্থাপিত এই প্রস্তাবকে সমর্থন দিয়েছে ফরাসি সরকারও।

আইনটি মূলত কয়েকজন মেয়রের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন, যারা সন্দেহজনক বা তথাকথিত ‘প্রতারণামূলক বিয়ে’ সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।

প্রস্তাবটির পেছনে যুক্তি হলো, কিছু বিদেশী নাগরিক শুধুমাত্র ফ্রান্সে বসবাসের বৈধতা অর্জনের উদ্দেশ্যে বিয়ের আশ্রয় নেন। ফলে স্থানীয় প্রশাসনকে এসব বিয়ের বৈধতা যাচাইয়ের অধিক ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন আইনটির সমর্থকরা। তবে মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এমন আইন কার্যকর হলে প্রকৃত দম্পতিরাও বৈষম্যের শিকার হতে পারেন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ ফ্রান্সের বেজিয়ে শহরের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা। ২০২৩ সালের ৭ জুলাই ইভা (ছদ্মনাম) নামের ৩২ বছর বয়সী এক ফরাসি নারী তার আলজেরীয় বাগদত্তা মুস্তাফাকে (ছদ্মনাম) নিয়ে বিয়ের জন্য সিটি হলে উপস্থিত হন। ইভা সেদিন বিয়ের পোশাক পরিহিত ছিলেন এবং সাথে ছিল তার তিন সন্তান। মুস্তাফাও পরেছিলেন নীল রঙের আনুষ্ঠানিক স্যুট। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানের পরিবর্তে তাদের সামনে অপেক্ষা করছিল এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি। সিটি হলের সামনে উপস্থিত ছিল সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা, বিক্ষোভকারী এবং কৌতূহলী জনতা। অনেকেই তাদের উদ্দেশে কটূক্তি ও অপমানজনক মন্তব্য করেন।

ইভার দাবি, অনুষ্ঠানের আগের দিন পৌরসভার নাগরিক নিবন্ধন বিভাগ কলে তাদের বিয়ের সময়সূচি নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন মেয়র রবার্ট মেনার নিজেই সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের বিয়ে সম্পন্ন করতে অস্বীকৃতি জানান।

বিয়ে বাতিল হওয়ার মাত্র ১৩ দিন পর মুস্তাফাকে ফ্রান্স ত্যাগের নির্দেশ কার্যকর করে আলজেরিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। এরপর থেকে ইভা ও মুস্তাফার পারিবারিক জীবন কার্যত স্থবির হয়ে আছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইভা বলেন, ‘আমাদের জীবন যেন থেমে গেছে। আমরা রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে গেছি।’

তার মতে, তারা একটি স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন গড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।

বিষয়টি এখানেই শেষ হয়নি। ফরাসি আইনে মেয়রদের দায়িত্ব হলো আইনগত শর্ত পূরণ হলে বিয়ে নিবন্ধন করা। কারো অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান বিয়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা হিসেবে বিবেচিত হয় না।

এই কারণে রবার্ট মেনারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের আইনগত দায়িত্ব পালন করেননি এবং রাষ্ট্রীয় আইন কার্যকরে বাধা সৃষ্টি করেছেন।

আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ত্রিব্যুনাল ঝ্যুদিসিয়ের দ্য মঁপেলিয়ে বা মন্টপেলিয়ের বিচারিক আদালতে তার বিচার অনুষ্ঠিত হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৭৫ হাজার ইউরো জরিমানার হতে পারে। ফ্রান্সে এ ধরনের অভিযোগে কোনো মেয়রের বিচার হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং এটিকে নজিরবিহীন মামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত আইনটি ফরাসি রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ডানপন্থী দলগুলো বলছে, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং ভুয়া বিয়ে প্রতিরোধে এই আইন প্রয়োজন।

তাদের মতে, মেয়রদের আরো বেশি ক্ষমতা দেয়া উচিত যাতে তারা সন্দেহজনক বিয়ে বন্ধ করতে পারেন।

অন্যদিকে বামপন্থী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও একজন ব্যক্তি বিয়ে করার মৌলিক অধিকার হারান না।

তারা সতর্ক করে বলেন, আইনটি কার্যকর হলে হাজারো আন্তরিক ও বৈধ সম্পর্কের দম্পতি প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি এবং ব্যক্তির পারিবারিক জীবনের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য কিভাবে রক্ষা করা হবে। ফরাসি সংবিধান এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ উভয়ই বিয়ে ও পারিবারিক জীবনের অধিকারকে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তাই জাতীয় পরিষদে এই আইন নিয়ে আলোচনা শুধু অভিবাসন নীতির প্রশ্ন নয়; বরং এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা নিয়েও একটি বৃহত্তর বিতর্কে পরিণত হয়েছে।