রাজধানীর উত্তরায় পুরোনো এয়ার কন্ডিশনার (এসি) মেরামতের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু। এরপর নাম পরিবর্তন, ধর্মান্তর, প্রভাবশালী মহলের সাথে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, সরকারি চাকরি ও টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার নামে প্রতারণা, বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ, শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এবং সর্বশেষ ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক। সেই শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ ইসলাম এবার নতুন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট হয়ে ময়মনসিংহ কারাগারে গেছেন।
একই সময়ে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ছাত্রজনতা বুধবার ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আত্মসাৎকৃত অর্থ ফেরত এবং সহযোগীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার ময়মনসিংহ জেলা যুগ্ম দায়রা জজ (অর্থ ও ঋণ) আদালতের বিচারক প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে হরিদাসকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মো: আনোয়ার আজিজ টুটুল জানান, ঢাকা জেলার একটি মামলায় গ্রেফতারের পর ফুলবাড়িয়া থানার দায়ের করা প্রতারণা মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কোতোয়ালি সিআর মামলা নং-১৪৯১/২০১২ (এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা) থেকে উদ্ভূত ৩২১৮/২০২৩ নম্বর মামলায় তার এক বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে গত ১২ জুলাই রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় তাকে গ্রেফতার করে। সিআইডির দাবি, তার ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। চার দিনের রিমান্ড শেষে গত ১৬ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস ২০১০ সালে ভারত থেকে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় পুরোনো এসি কেনাবেচা ও মেরামতের ব্যবসা শুরু করেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ব্যবহার শুরু করেন। পরে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার এক তরুণীকে বিয়ে করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন।
ক্রমেই সরকারি ঘর, নলকূপ, চাকরি, বদলি ও টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিজের সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন তিনি। ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান।
এদিকে ফুলবাড়িয়ার বালিয়ান এলাকায় তার গড়ে তোলা বিলাসবহুল রিসোর্ট নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খাস জমি ও খালের অংশ দখল করে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। পরে এটি ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামে পরিচিতি পায়। চলতি বছরের জুনে গাইবান্ধায় ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে তিনি আবারো আলোচনায় আসেন। পরে স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ স্থগিত করে।
অন্যদিকে বুধবার দুপুরে নগরীর সি কে ঘোষ রোডে ময়মনসিংহ প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতারিত পরিবার ও ছাত্রজনতার ব্যানারে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়।
মানববন্ধন থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—হরিদাসের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, আত্মসাৎ করা অর্থ দ্রুত ফেরত ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রে জড়িত সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দেয়া।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, হরিদাস নিজেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দিয়ে সরকারি চাকরি, বদলি, উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলার শতাধিক পরিবারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তিনি সম্পাদিত ছবি ব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
ভুক্তভোগী আবুল কালাম অভিযোগ করেন, ছেলেকে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা নেয়া হয়। পরে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে আরো অর্থ সংগ্রহ করে সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন। পাওনা শোধ করতে নিজের জমিও বিক্রি করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরেক ভুক্তভোগী সফিকুল ইসলাম বলেন, তার দোকান থেকে ১৪ লাখ ৫২ হাজার টাকার রড, সিমেন্ট, স্যানিটারি সামগ্রী ও ৩৬টি মোটর পাম্প নেয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।
মানবাধিকার কর্মী গোলাম মোরশেদ খান অভিযোগ করেন, প্রতারণার তথ্য প্রকাশ করায় তাকে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় হোয়াটসঅ্যাপে হত্যার হুমকি দেয়া হয় এবং পরে হামলারও শিকার হন।
এদিকে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট হরিদাসের নামে-বেনামে থাকা ব্যাংক হিসাব, এমএফএস লেনদেন, জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ফুলবাড়িয়ার রিসোর্টে বিনিয়োগ এবং সম্পদের বৈধতার উৎস খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি তার আর্থিক লেনদেনের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে বর্ণিত প্রতারণা, অর্থপাচার, জমি দখল ও অন্যান্য অভিযোগের বেশ কয়েকটি বর্তমানে তদন্তাধীন বা বিচারাধীন। এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি।