স্বপ্নের ইউরোপে যাওয়া হলো না সিলেট বিভাগের ৩ জেলার ২৪ জন যুবকের। ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হওয়ার পর তাদের ঠাঁই হয়েছে মিসরের একটি কারাগরে। আরো ৯ জনের স্বপ্ন শেষ হয়েছে ভূমধ্যসাগরে ডুবে। অনাহারে সেখানে মৃত্যুবরণকারী ৯ জনের লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়।

মিসরের বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে দিকভ্রান্ত হয়ে মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছানো সিলেটের ২৪ জন যুবকসহ ২৯ বাংলাদেশী নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৭ জন সুস্থ হয়ে বর্তমানে স্থানীয় পুলিশ হেফাজতে একটি অস্থায়ী কারাগারে বন্দী রয়েছেন। অপর দুই বাংলাদেশী নাগরিক এখনো মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

উদ্ধার হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১৮ জন, হবিগঞ্জের ৩ জন, সিলেটের ৩ জন, কিশোরগঞ্জের ২ জন ও মাদারীপুরের ১ জন রয়েছেন।

এদিকে জীবিত উদ্ধার হওয়া অভিবাসন প্রত্যাশীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌকাটিতে থাকা আরো ৯ বাংলাদেশী নাগরিক সাগরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের লাশ সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জীবিত উদ্ধার হওয়া সুনামগঞ্জের আব্দুল করিম। তবে তাদের গ্রামের বাড়ি কোথায় বিস্তারিত জানাননি তিনি।

জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট মানবপাচার চক্রের সহায়তায় লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে একটি নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন ২৪ জন সিলেটিসহ বাংলাদেশী অভিবাসন প্রত্যাশীরা। ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর এটি দিকভ্রান্ত হয়ে প্রায় ১০ দিন সাগরে ভাসমান থাকার পর গত ১৩ আগস্ট মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। পরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় বাংলাদেশী নাগরিকদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

কারাগারে থাকা সিলেট বিভাগের ২৪ জন হলেন- সুনামগঞ্জের তায়েবুর রহমান, মো: মাহফুজ মিয়া, মো: লোহানী আহমেদ, বদর উদ্দিন, সোহেল মিয়া, মো: হোসাইন আহমেদ, আলিম উদ্দিন, সাব্বির হোসেন তালহা, এনাম উদ্দিন, আবু সাঈদ এয়াহিয়া, আব্দুল করিম ও মো: মামুন খান, দিরাইয়ের নাইম আহমেদ, জগন্নাথপুরের সাইদুল ইসলাম, মো: হোসাইন মিয়া, আরিফ আহমেদ, হুজাইফা বিন হোসাইন, ছাতকের তোফায়েল আহমেদ, হবিগঞ্জের মোস্তাকিন ভূঁইয়া, আজমেরিগঞ্জের সোহেল মিয়া, রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, সিলেটের গোয়াইনঘাটের তানভীর হোসেন, বিয়ানীবাজারের রাজু মিয়া ও নজরুল ইসলাম।

এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া অপর ৩ জন হলেন- মাদারীপুরের মো: ফারুক, কিশোরগঞ্জ অষ্টগ্রামের সায়মন মিয়া ও ভৈরবের মহরম আলী। এ ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আরো দুই বাংলাদেশী নাগরিকের নাম পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো: জাকির হোসেন জানান, মানবপাচার চক্রের সহায়তায় গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবুক এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেন বাংলাদেশীসহ অভিবাসন প্রত্যাশীরা। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্রিসে যাওয়ার পথে নৌকাটি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং গত ১৩ আগস্ট মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়।

তিনি জানান, ভাসমান নৌকা থেকে অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা বাংলাদেশী নাগরিকদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। তাদের মধ্যে ২৭ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তারা মারসা মাতরুহ পুলিশ স্টেশনের সাথে সংযুক্ত একটি অস্থায়ী কারাগারে আটক রয়েছেন।

এ ছাড়াও নৌকাটিতে শামীম আহমেদ ও হাবিব উল্লাহ নামের দুটি পরিচয়পত্র এবং হৃদয় পাল, মো: হাবিব উল্লাহ ও নুর আলম নামের ৩টি পাসপোর্ট পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে দূতাবাসকে অবহিত করেছে মাসরা-মাতরুহ পুলিশ।

জাকির হোসেন জানান, হাসপাতালে আরো দুই বাংলাদেশী নাগরিক চিকিৎসাধীন বলে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ দূতাবাসকে জানিয়েছে। তবে তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে সুস্থ হয়ে পুলিশ হেফাজতে থাকা বাংলাদেশীদের ছবি ও ঠিকানা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

দূতাবাসের এই কর্মকর্তা আরো জানান, এ ঘটনায় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মেহেদি হাসান, বাবা মো: সাবু মিয়া, মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে গত ১৬ আগস্ট বিকেলে একই উপকূল থেকে আরো এক বাংলাদেশী নাগরিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে লাশ দুটি মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত রয়েছে।

লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং সাগরে নিখোঁজ ওই নয় বাংলাদেশীর নাম-পরিচয় ও ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য জীবিত উদ্ধার হওয়া সহযাত্রীদের সাক্ষাৎকার নেয়া জরুরি বলে জানিয়েছেন দূতাবাসের কর্মকর্তা। এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জাকির হোসেন আরো জানান, মিসরের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালত ও প্রসিকিউশনের সিদ্ধান্তের পর আটক ২৭ বাংলাদেশীর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। একইসাথে মর্গে সংরক্ষিত দুই লাশের পরিচয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হবে। আইনগত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্রুত আটক বাংলাদেশীদের দেশে ফেরত পাঠানো এবং লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।