ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার খেরুয়াজানী ইউনিয়নের হরিপুর দেউলী গ্রামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ এখন অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে।
স্থানীয়দের কাছে ‘ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ’ নামে পরিচিত ১৮টি স্তম্ভঘেরা দুই গম্বুজবিশিষ্ট এ প্রাচীন মসজিদকে প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো বলে মনে করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইট-সুড়কির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটির পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে যেকোনো সময় স্থাপনাটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৮ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনের সময় আত্মগোপনে থাকা ফকিররা এই মসজিদে ইবাদত করতেন।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ১১৩৫ বঙ্গাব্দে মসজিদটির সর্বশেষ বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। এরপর প্রায় তিন শতক ধরে আর কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার হয়নি। মসজিদটিকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি।
স্থানীয়দের দাবি, মাঝে মাঝে মসজিদের দেয়াল থেকে ঘামের মতো পানি ঝরে পড়ে এবং জায়নামাজও ভিজে যায়। পরে আবার দেয়াল স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যায়। যদিও এ ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তবুও এটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর বিশ্বাস ও আলোচনার বিষয়।
মসজিদের খতিব মো: বাদী বিল্লাহ বলেন, বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে এক ধরনের শীতলতা ও মানসিক প্রশান্তি অনুভূত হয়। অনেক মানুষ শুধু কিছুক্ষণ বসে আত্মিক প্রশান্তি লাভের জন্যও এখানে আসেন।
তিনি জানান, অতীতে বহু আলেম-ওলামা ও বুজুর্গ ব্যক্তি এই মসজিদে রাত জেগে ইবাদত করতেন। তাদের কাছ থেকেই বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়। তবে মসজিদের প্রকৃত নির্মাতার পরিচয় এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
স্থানীয় মুসল্লি আবুল হোসেন বলেন, এই মসজিদে নামাজ আদায় করলে অন্যরকম প্রশান্তি পাওয়া যায়।
আরেক মুসল্লি কাদির মিয়ার মতে, মসজিদের নির্মাণশৈলী, ব্যবহৃত ইট ও গাঁথুনির ধরন দেখে এটি মুঘল যুগ বা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যধারার নিদর্শন বলে মনে হয়। এ বিষয়ে গবেষণা হলে প্রকৃত ইতিহাস আরো স্পষ্ট হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ আলী জানান, মসজিদের পাশে থাকা দুইটি পুরোনো কবরের একটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। পুরো স্থাপনাটিই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখনই সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে বঞ্চিত হবে।
২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সংস্কারকাজ শুরু হয়নি। এমনকি সংরক্ষিত পুরাকীর্তির পরিচয় বহনকারী কোনো সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়নি।
প্রত্নতত্ত্ব গবেষক স্বপন ধর বলেন, এটি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মসজিদ। বারো ভূঁইয়ার ইতিহাস, বিশেষ করে ইশা খাঁর শাসনামলের সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগীয় ছোট আকারের এক বা দুই গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের স্থাপত্যের সাথে এর সুস্পষ্ট মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, বহু প্রচেষ্টার মাধ্যমে মসজিদটি গেজেটভুক্ত করা হলেও এখনো সংস্কারকাজ শুরু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ কেবল নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ঈমান, শিক্ষা, সমাজগঠন ও সভ্যতার কেন্দ্র। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, বরং আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য আমানত।
অবহেলা আর সময়ের নির্মম আঘাতে এই ঐতিহাসিক ইবাদতখানা হারিয়ে যাওয়ার আগেই প্রয়োজন জরুরি সংরক্ষণ ও সংস্কার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগই পারে প্রাচীন শতাব্দীর এই ইসলামী ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ রাখতে।